হাঁটার অবিশ্বাস্য যত উপকারিতা, সুস্থ মন ও শরীর গঠনে এক সহজ সমাধান

আমরা সবাই হাঁটি, কিন্তু কজনই বা পর্যাপ্ত হাঁটি? বর্তমান আধুনিক জীবনযাত্রায় শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা যেন এক সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাঁটার অসংখ্য উপকারিতা রয়েছে, যা আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে বহু গুণে উন্নত করতে পারে। আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজের স্নায়ুবিজ্ঞানী প্রফেসর শেন ও’মারা হাঁটার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন, যা সুস্থ জীবনযাপনে হাঁটার অপরিহার্যতা প্রমাণ করে।

মস্তিষ্ককে রাখে সক্রিয়
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা শুধু পেশী দুর্বল করে না, মস্তিষ্কের কার্যকারিতাও হ্রাস করে। প্রফেসর ও’মারা ব্যাখ্যা করেন, হাঁটার সময় পেশী থেকে নির্গত অণু মস্তিষ্কের রক্ত ​​সঞ্চালনে সহায়তা করে এবং মস্তিষ্কের কোষের বিকাশে সাহায্য করে, যা মস্তিষ্ককে আরও শক্তিশালী করে তোলে। নিয়মিত হাঁটা মস্তিষ্কের সতেজতা বজায় রেখে বার্ধক্য প্রতিরোধে সহায়তা করে।

হৃদপিণ্ডের স্বাস্থ্য উন্নত করে
হৃদপিণ্ড সুস্থ রাখতে হাঁটা অত্যন্ত উপকারী। শেন ও’মারা উল্লেখ করেন, আমাদের পূর্বপুরুষরা যারা শিকারের মাধ্যমে জীবনধারণ করতেন, তারা দিনে ১৫ থেকে ১৭ মাইল হাঁটতেন এবং তাদের হৃদপিণ্ড বর্তমানের মানুষের চেয়ে অনেক বেশি সুস্থ ছিল। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ আমেরিকার সিমানে গোত্রের ৮০ বছর বয়সী ব্যক্তিদের হৃদপিণ্ড ৫০ বছর বয়সী একজন আমেরিকান ব্যক্তির হৃদপিণ্ডের মতো কাজ করে, যার মূল কারণ তাদের সারাদিনের সক্রিয় জীবনযাপন।

হজম প্রক্রিয়াকে সাহায্য করে
হাঁটা আমাদের পরিপাকতন্ত্রের জন্য একটি দারুণ বন্ধু। নিয়মিত হাঁটা হজম প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে। ওষুধের পরিবর্তে হাঁটাকে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করলে হজম সংক্রান্ত অনেক সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

সমস্যা সমাধানে সহায়ক
বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে হাঁটা সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করে এবং জটিল সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে। শেন ও’মারা বলেন, কোনো সমস্যা নিয়ে হতাশ হয়ে বসে না থেকে একটু হাঁটাহাঁটি করলে তা সমাধানের পথ খুলে দিতে পারে। অনেক বিখ্যাত লেখক, দার্শনিক এবং গণিতজ্ঞ তাদের জটিল সমস্যার সমাধান হাঁটার মাধ্যমেই খুঁজে পেয়েছেন। ঔপন্যাসিক স্টিফেন কিং এবং দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যারা হাঁটার সময় তাদের চিন্তাভাবনা টুকে রাখতেন এবং পরে তা থেকে দারুণ সব কাজ তৈরি করেছেন।

বিষণ্ণতা কাটায়
স্নায়ুবিজ্ঞানী শেন ও’মারা নিষ্ক্রিয়তা ও বিষণ্ণতার মধ্যে একটি সরাসরি সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, যারা নিষ্ক্রিয় থাকেন তাদের মধ্যে বিষণ্ণতার হার বেশি। সক্রিয় জীবনযাপন, বিশেষ করে পর্যাপ্ত হাঁটা, রক্ত প্রবাহের সমস্যা কমিয়ে বিষণ্ণতা প্রতিরোধে এক ধরনের টিকার মতো কাজ করে।

খোলা মন ও বহির্মুখী ব্যক্তিত্ব গঠনে সহায়ক
একটি তত্ত্ব অনুসারে, সক্রিয় জীবনযাপন আমাদের ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন ইতিবাচক দিক, যেমন অকপটতা, বিবেক দিয়ে পরিচালিত হওয়া, বহির্মুখী হওয়া এবং সহনশীলতা, বৃদ্ধিতে সহায়ক। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিষ্ক্রিয় থাকেন তারা কম খোলা মনের, কম বহির্মুখী হন এবং স্নায়ুজনিত সমস্যায় বেশি ভোগেন। এর বিপরীতে, সক্রিয় ব্যক্তিরা এসব সমস্যা থেকে মুক্ত থাকেন এবং সহজে অসুস্থ হন না।

বিপাক প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে
আমরা যে খাদ্য গ্রহণ করি তা বিভিন্ন শক্তিতে রূপান্তরিত হয় এবং হাঁটা এই রূপান্তর প্রক্রিয়াকে সহায়তা করে। সারা দিন ধরে অল্প মাত্রায় সক্রিয় থাকা জিমে গিয়ে শরীরচর্চা করার চেয়েও বেশি উপকারী প্রমাণিত হয়েছে। অনেকে জিমে এক ঘণ্টা ব্যয় করে সারা দিন নিষ্ক্রিয় থাকেন, যা আসলে সুস্থ থাকার সঠিক উপায় নয়।

শারীরিক গঠন অটুট রাখে
দীর্ঘক্ষণ চেয়ার, সোফা বা গাড়িতে বসে কাজ করার ফলে পিঠে ব্যথা সহ শারীরিক গঠনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। মানুষের দেহ দীর্ঘক্ষণ একই অবস্থানে থাকার জন্য তৈরি হয়নি। চেয়ার থেকে উঠে নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করলে পিঠের ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় এবং শারীরিক গঠন অটুট থাকে।

সামগ্রিকভাবে, হাঁটা একটি সহজলভ্য এবং অত্যন্ত কার্যকর অনুশীলন যা আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে বহুভাবে উন্নত করতে পারে। তাই সুস্থ ও সতেজ জীবন যাপনের জন্য প্রতিদিনের রুটিনে হাঁটাকে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।