ফুসফুসের শত্রু কারা? ধূমপান, দূষণ ও রাসায়নিক যেভাবে নিঃশব্দে নষ্ট করে দিচ্ছে আপনার ফুসফুস!

ফুসফুস মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এই অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হলে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। বিশ্বজুড়ে নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যে ক্যানসারে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো ফুসফুসের ক্যানসার।

ফুসফুসের ক্যানসার এমন একটি রোগ, যেখানে ফুসফুসের টিস্যুতে বিপজ্জনক কোষ তৈরি হয়। মূলত ছোট কোষের ফুসফুসের ক্যানসার (Small Cell Lung Cancer) এবং নন-স্মল সেল ফুসফুসের ক্যানসার (Non-Small Cell Lung Cancer) – এই দুটিই ফুসফুসের ক্যানসারের প্রধান প্রকার।

ফুসফুসের ক্যানসারের মূল কারণগুলো কী কী?
ফুসফুসের ক্যানসার হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ দায়ী, যার মধ্যে সবচেয়ে সাধারণগুলো হলো:

তামাক ও ধূমপান: প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ধূমপান।
বায়ু দূষণ: শহুরে বা শিল্পাঞ্চল এলাকায় দূষিত বাতাসের সংস্পর্শ।
বিকিরণ: রেডন বা অন্যান্য বিকিরণের সংস্পর্শ।
রাসায়নিকের সংস্পর্শ: অ্যাসবেস্টস, কয়লা, সিলিকা, বেরিলিয়াম, আর্সেনিক, নিকেল ইত্যাদি।
পারিবারিক ইতিহাস: ক্যানসারের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বাড়ে।
ভারতের যশোদা হাসপাতাল, হায়দ্রাবাদের কনসাল্ট্যান্ট ক্লিনিক্যাল ও ইন্টারভেনশনাল পালমোনোলজিস্ট ডা. ভি প্রতিভা প্রসাদ ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় এমন তিনটি প্রধান কারণ এবং প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন।

যে ৩টি জিনিস ধীরে ধীরে ফুসফুসকে নষ্ট করে:
১. তামাক ব্যবহার:
তামাক ব্যবহার ফুসফুসের ক্যানসারের এক নম্বর কারণ। প্রায় ৯০ শতাংশ ফুসফুসের ক্যানসার তামাক ব্যবহারের কারণে হয়। সিগারেট, সিগার, পাইপ, হুক্কা, ইলেকট্রনিক সিগারেট এবং যেকোনো ধরনের তামাক সেবন ফুসফুসের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। অধূমপায়ীদের তুলনায় ধূমপায়ীদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় ২০ গুণ বেশি। তাই ফুসফুসের ক্যানসার প্রতিরোধের সর্বোত্তম উপায় হলো অবিলম্বে ধূমপান ত্যাগ করা।

২. পরোক্ষ ধূমপান:
নিজেরা ধূমপান না করলেও, ধূমপায়ীদের আশেপাশে থাকলে ‘সেকেন্ডহ্যান্ড ধোঁয়া’ বা পরোক্ষ ধূমপানও সমান ক্ষতিকারক। এতে সিগারেটের মতোই বিষাক্ত রাসায়নিক থাকে, যা ফুসফুসের কোষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। আপনার ধূমপান ত্যাগ শুধু আপনার জন্যই নয়, আপনার পরিবারের সদস্যদের সুস্থতার জন্যও অপরিহার্য।

৩. বিকিরণ ও রাসায়নিক:
পরিবেশ দূষণের কারণে অনেকেই প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের বিকিরণ ও রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসেন। বিশেষ করে রেডন নামক গ্যাস ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। এই ধরনের বিকিরণ এড়ানোর চেষ্টা করুন। এছাড়াও, অ্যাসবেস্টস, কয়লা, সিলিকা, বেরিলিয়াম, আর্সেনিক, নিকেল ইত্যাদির মতো ক্ষতিকারক রাসায়নিকের দীর্ঘায়িত সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা উচিত।

ফুসফুসের ক্যানসার প্রতিরোধের উপায় কী?
ফুসফুসের ক্যানসার প্রতিরোধের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:

ফুসফুসের ক্যানসার স্ক্রিনিং: নিয়মিত ফুসফুসের চেকআপ বা স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক অবস্থাতেই ক্যানসার শনাক্ত করা এবং সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করা সম্ভব। ডা. প্রতিভা জানান, যদি আপনি ধূমপায়ী হন, আপনার বয়স ৫০-৮০ বছরের মধ্যে হয় এবং বিগত ২০ বছর ধরে প্রতিদিন গড়ে ১ প্যাকেট সিগারেট সেবন করেন, তাহলে নিয়মিত ফুসফুসের স্ক্রিনিং করানো জরুরি। এমনকি যদি আপনি ধূমপান ছেড়েও দিয়ে থাকেন (১৫ বছর আগে), তাহলেও ফুসফুসের পরীক্ষা করানো উচিত।

স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও শরীরচর্চা: ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের ফল, সবজি ও গোটা শস্য অন্তর্ভুক্ত করুন। এগুলো ভিটামিন, মিনারেল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। একই সঙ্গে প্রতিদিন ফুসফুসের ব্যায়াম ও নিয়মিত শরীরচর্চা করলে ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমে।