পুরুষের চেয়ে নারীরাই বেশি মানসিক জটিলতায় ভোগেন! কারণ ও সমাধানের পথ বাতলালেন বিশেষজ্ঞরা

শারীরিক অসুস্থতার মতোই মানসিক সমস্যাও জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে অনেক নারীকেই বিপর্যস্ত করে তোলে। গবেষণা বলছে, পুরুষদের তুলনায় নারীরা মানসিকভাবে অনেক বেশি জটিলতা এবং অবসাদের ঝুঁকিতে থাকেন। এটি এমন একটি মানসিক ব্যাধি যা চরম পর্যায়ে আত্মহত্যার দিকেও ধাবিত করতে পারে। তাই প্রতিটি মানুষের পাশাপাশি নারীদেরও নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষভাবে সতর্ক থাকা জরুরি।

এই প্রসঙ্গে কলকাতার ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের সাইক্রিয়াট্রি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপিকা ডা. শর্মিলা সরকার জানান, নারীরা ওবসেসিভ কমপালসিভ ডিজঅর্ডারে (ওসিডি)-তে পুরুষদের তুলনায় বেশি ভোগেন। এর ফলস্বরূপ অবসাদ, দুশ্চিন্তা এবং ঘন ঘন মেজাজ পরিবর্তনের মতো সমস্যা নারীদের মধ্যে অনেক বেশি দেখা যায়। তবে সিজোফ্রেনিয়ার মতো রোগ নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই সমানভাবে দেখা দিতে পারে।

কেন নারীদের মানসিক সমস্যা বেশি হয়?

ডা. শর্মিলা সরকার নারীদের মানসিক সমস্যার কিছু প্রধান কারণ তুলে ধরেন:

মাল্টিটাস্কিং: নারীরা সাধারণত বহু কাজের সমন্বয় করে থাকেন। একদিকে সংসার সামলানো, অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন – এই বহুমুখী চাপের কারণে অনেক সময় মানসিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। একই সময়ে একাধিক বিষয়ে মনোযোগ দিতে গিয়ে মানসিক চাপ বাড়ে।

হরমোনের প্রভাব: নারীদের শরীরে হরমোনের বিশেষ প্রভাব থাকে। এই হরমোনজনিত কারণেও নারীদের মধ্যে ডিপ্রেশন দেখা দিতে পারে। ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মতো হরমোনের ওঠানামা মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে।

পিরিয়ডসের আগের ও পরের পরিবর্তন: পিরিয়ডসের আগে ও পরে নারীদের শরীর ও মনে কিছু বিশেষ পরিবর্তন আসে। এই পরিবর্তনগুলিও মানসিক অস্থিরতা ও উদ্বেগের কারণ হতে পারে। হরমোনের পরিবর্তনের কারণে আবেগ ও মুড সুইং হতে পারে।

গর্ভাবস্থাকালীন পরিবর্তন: গর্ভাবস্থায় নারী শরীরে নানা ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়। এই সময় শরীরে হরমোনের বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে, যা থেকে মানসিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। ঘন ঘন মেজাজ পরিবর্তন এই সময়ের একটি সাধারণ ঘটনা।

মেনোপজের প্রভাব: মাসিকচক্র বন্ধ হয়ে যাওয়া অর্থাৎ মেনোপজের পরেও নারীর শরীরে হরমোনের তারতম্য দেখা যায়। এই সময় শারীরিক ও মানসিক নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। হরমোনের অভাব মানসিক অস্থিরতা ও বিষণ্নতা বাড়াতে পারে।

মনের কথা চেপে রাখা: নারীরা প্রায়শই নিজেদের সমস্যা প্রকাশ করতে পারেন না। সামাজিক বা পারিবারিক কারণে অনেক সময় তারা মুখ বুজে কষ্ট সহ্য করেন। এই চাপা কষ্ট মনের উপর প্রভাব ফেলে এবং একসময় ডিপ্রেশনে রূপ নেয়।

নারীর মানসিক সমস্যার সমাধানের উপায়:

ডা. শর্মিলা সরকার এই সমস্যা সমাধানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপায় বাতলেছেন:

স্বনির্ভরতা অর্জন: নারীদের আরও বেশি স্বনির্ভর হতে হবে। অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে স্বাবলম্বী হলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং মানসিক চাপ মোকাবিলা করা সহজ হয়।

ঘরবন্দি জীবন পরিহার: ঘরবন্দি না থেকে বাইরের জগতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে হবে। নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ মনের স্বাস্থ্যকে ভালো রাখে।

মনের মতো জীবন উপভোগ: নিজের পছন্দের কাজ করা, শখের প্রতি মনোযোগ দেওয়া এবং জীবনকে নিজের মতো করে উপভোগ করা মানসিক স্বাস্থ্যকে উন্নত করে।

যোগাযোগ স্থাপন: নিজের আবেগ ও অনুভূতি বিশ্বস্ত বন্ধু বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক।

চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ: যেকোনো মানসিক সমস্যা দেখা দিলে দ্বিধা না করে দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করলে দ্রুত সুস্থ হওয়া সম্ভব।

নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তাদের সমস্যা সমাধানে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। সচেতনতা এবং সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমেই নারীরা একটি সুস্থ ও সুন্দর জীবন যাপন করতে পারেন।