শ্বেতী রোগ: কারণ, নির্ণয় ও আধুনিক চিকিৎসা

শ্বেতী রোগ আমাদের দেশে একটি পরিচিত স্বাস্থ্য সমস্যা। প্রায়শই বহু মানুষকে এই রোগ নিয়ে দৈনন্দিন জীবনে চলতে দেখা যায়। তবে এই রোগ নিয়ে সমাজে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। ত্বক সাদা হলেই অনেকে মনে করেন সেটি শ্বেতী রোগ। এই রোগের সঠিক নির্ণয় ও আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ত্বক এবং যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রাশেদ মো. খান।
অধ্যাপক ডা. রাশেদ মো. খান জানান, আমাদের ত্বকের মেলানোসাইট কোষ মেলানিন নামক রঞ্জক পদার্থ তৈরি করে। কোনো কারণে এই কোষগুলো নষ্ট হয়ে গেলে ধীরে ধীরে ত্বক তার স্বাভাবিক রঙ হারাতে শুরু করে এবং সাদা হয়ে যায়।
ত্বক সাদা হলেই কি শ্বেতী রোগ?
ডা. খান স্পষ্ট করে বলেন, ত্বক সাদা হওয়ার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। অনেক সময় রক্তনালির কোনো অংশ সংকুচিত হলে সেই স্থান সাময়িকভাবে সাদা দেখাতে পারে। ছোটবেলা থেকে লালচে বা বাদামি তিলের পাশাপাশি সাদা তিলও দেখা যেতে পারে, যা বয়সের সঙ্গে বড় হতে থাকে এবং একে নেভাস অ্যামিনিকাস বলা হয়। এছাড়াও, রোদে পোড়া বা সানবার্নের কারণে ত্বকের কিছু অংশ পুড়ে গিয়ে সাদা ছোপ তৈরি হতে পারে। এমনকি, ম্যালাসেজিয়া নামক এক ধরনের ফাঙ্গাল ইনফেকশনের কারণেও ত্বকে সাদা দাগ হতে পারে, যা ছুলি নামে পরিচিত। তাই শুধু ত্বক সাদা হলেই তাকে শ্বেতী রোগ ধরে নেওয়া উচিত নয়।
কখন ও কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
অধ্যাপক খান জানান, সাধারণত ২০ বছর বয়সের পর শ্বেতী রোগ বেশি দেখা যায়, তবে এটি যেকোনো বয়সেই হতে পারে। যদি পরিবারের কারো শ্বেতী রোগ থাকে, তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ২০ শতাংশ। তবে এটি মনে রাখা জরুরি যে শ্বেতী রোগ কোনোভাবেই ছোঁয়াচে বা সংক্রামক নয়।
ত্বক বিশেষজ্ঞরা শ্বেতী রোগ নির্ণয়ের জন্য উডস ল্যাম্প নামক একটি বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করেন। এই যন্ত্রের আলোতে শ্বেতী আক্রান্ত ত্বক দুধের মতো বা চকচকে সাদা দেখায়, যা রোগ নির্ণয়ে সাহায্য করে। সাধারণত মুখের চারদিকে, আঙুলের মাথায় ও হাতের পাশে শ্বেতী রোগ বেশি দেখা যায়। শ্বেতী হলে খাবার নির্বাচনে কোনো বিশেষ বিধিনিষেধ নেই। তবে অতিরিক্ত পরিমাণে ভিটামিন সি গ্রহণ করলে তা মেলানিন তৈরির প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
করণীয় ও চিকিৎসা
অধ্যাপক ডা. রাশেদ মো. খান বলেন, অনেকের মধ্যে এই ধারণা প্রচলিত আছে যে শ্বেতী রোগ কখনো ভালো হয় না। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। রোগ দেরিতে ধরা পড়লে বা পুরো শরীরে ছড়িয়ে গেলে চিকিৎসা করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রাথমিক চিকিৎসায় ২০ শতাংশ হাইড্রোকুইনোনযুক্ত মলম ব্যবহার করা হয়।
তিনি আরও বলেন, মেলানিন ত্বকে সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে রক্ষা করে। শ্বেতী রোগীদের ত্বকে এই সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় রোদে বের হওয়ার আগে ছাতা ব্যবহার করা বা শরীর ঢাকা পোশাক পরা এবং সানস্ক্রিন ব্যবহার করা অপরিহার্য।
এই রোগে আক্রান্ত রোগীদের চুল এবং লোমও সাদা হয়ে যেতে পারে। তবে শরীরের লোমযুক্ত অংশে শ্বেতী হলে তুলনামূলকভাবে তাড়াতাড়ি ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ঠোঁট ও আঙুলের মাথার শ্বেতীর চিকিৎসা কঠিন হতে পারে। সাধারণত শ্বেতী রোগে চুলকানি হয় না, তবে যদি এর সঙ্গে একজিমা থাকে তবে চুলকানি হতে পারে।
অধ্যাপক খান আক্ষেপ করে বলেন, সমাজে অনেকেরই শ্বেতী রোগ নিয়ে ভুল ধারণা রয়েছে। কেউ কেউ এটিকে কুষ্ঠরোগের মতো ভেবে রোগীর সঙ্গে মিশতে দ্বিধা বোধ করেন। এই কারণে রোগী ও তার পরিবারের সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজন। শ্বেতী রোগের সাদা দাগ কসমেটিক মেকআপের মাধ্যমে ঢেকে দেওয়া যায়, যাকে কসমেটিক কেমোফ্লাক্স বলা হয়।
তিনি আরও জানান, শ্বেতীর যে অংশে মেলানোসাইট কোষ সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে, সেখানে ওষুধ দিয়ে তেমন ফল পাওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে শরীরের ভালো অংশ থেকে কোষ নিয়ে সাদা অংশে মিনিপাঞ্চ গ্রাফটিং করা হয়। এছাড়াও, মেলানোসাইট ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা কালচারও একটি আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি। ফটোথেরাপি বা নেরোবেন্ডইউভিবিও এই রোগের কার্যকরী চিকিৎসা। এটি সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন নিতে হয়।
অধ্যাপক ডা. রাশেদ মো. খান আশার বাণী শুনিয়ে বলেন, আধুনিক গবেষণায় শ্বেতী রোগের নতুন নতুন কার্যকরী চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবিত হচ্ছে এবং চিকিৎসকরা তা ব্যবহার করছেন। তবে এই রোগীদের সবসময় সরাসরি সূর্যের আলো এড়িয়ে চলা উচিত।