ক্যানসারের নাম শুনলেই আতঙ্কিত হন অনেকেই। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ এবং বয়স, জিন ও জীবনযাত্রার অভ্যাসের উপর নির্ভর করে এর ঝুঁকি বাড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ক্যানসার বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ।
যদিও স্তন, কোলোরেক্টাল, ফুসফুস, সার্ভিকাল ও থাইরয়েড ক্যানসার নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, তবে ফুসফুস, প্রোস্টেট, কোলোরেক্টাল, পাকস্থলী ও লিভার ক্যানসারে আক্রান্তের সংখ্যা পুরুষদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি।
সবার শরীরে ক্যানসারের লক্ষণ গুরুতরভাবে প্রকাশ পায় না। অনেকের শরীরে খুবই হালকাভাবে কিছু উপসর্গ দেখা যায়, যা সাধারণ ভেবে পুরুষরা প্রায়শই উপেক্ষা করেন। এই অবহেলা পরবর্তীকালে মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তাই পুরুষদের জন্য ক্যানসারের এমন ৮টি বিপজ্জনক লক্ষণ সম্পর্কে জেনে রাখা জরুরি, যা মোটেও এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়:
১. টেস্টিস বা অণ্ডকোষের পরিবর্তন:
পুরুষদের অণ্ডকোষের আকার, রং বা টেক্সচারের কোনো পরিবর্তন হলে তা অবশ্যই পরীক্ষা করানো উচিত। নারীদের যেমন ঘন ঘন স্তন পরীক্ষা করতে বলা হয়, পুরুষদেরও তেমনি অণ্ডকোষ পরীক্ষা করা জরুরি। যদি দেখেন উভয় অণ্ডকোষ আকারে বড় হয়েছে বা কোনো পিণ্ড অনুভব করছেন, তাহলে মোটেও অবহেলা করবেন না। এটি টেস্টিকুলার ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে। এমন কিছু দেখলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
২. ত্বকের পরিবর্তন:
ত্বকের ক্যানসার নারী-পুরুষ উভয়েরই হতে পারে। আমেরিকান একাডেমি অব ডার্মাটোলজি অ্যাসোসিয়েশন অনুসারে, নারীদের তুলনায় পুরুষদের মেলানোমায় (এক প্রকার মারাত্মক ত্বকের ক্যানসার) মারা যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যদি ত্বকে অস্বাভাবিক কোনো পিণ্ড, ঘা থেকে রক্তপাত, স্কেলিং, আঁচিল বা ফ্রেকলসের পরিবর্তন দেখতে পান, তাহলে দ্রুত ত্বক পরীক্ষা করান এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৩. প্রস্রাব করতে অসুবিধা হওয়া:
প্রস্রাব করতে অসুবিধা হওয়া প্রস্টেটের সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। যদি এর সঙ্গে প্রস্রাব বা বীর্যের সঙ্গে রক্তপাত ঘটে, ব্যথা ও অস্বস্তি হয় অথবা ইরেক্টাইল ডিসফাংশন অনুভব করেন, তাহলে সতর্ক থাকুন। কারণ এটি প্রস্টেট ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না করালে এটি প্রাণঘাতীও হতে পারে।
৪. একটানা কাশি:
দীর্ঘস্থায়ী ও ক্রমাগত কাশি বিভিন্ন কারণে হতে পারে। তবে এই লক্ষণ মোটেও সাধারণ বিষয় নয়। যদি ঠান্ডা বা অ্যালার্জির উপসর্গ ছাড়া তিন সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে একটানা কাশি থাকে এবং এর সঙ্গে শ্বাসকষ্ট বা কাশির সঙ্গে রক্ত পড়ে, তাহলে অবিলম্বে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এটি ফুসফুসের ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে।
৫. মুখের ঘা:
ভিটামিনের ঘাটতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন কারণে মুখে ঘা হতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যা না সারলে, ব্যথা হলে, ফোলাভাব ও অসাড়তা বোধ করলে সতর্ক হয়ে যান। কারণ এগুলো মুখের ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে। বিশেষ করে যারা তামাক চিবিয়ে খান কিংবা ধূমপান করেন, তাদের ক্ষেত্রে ওরাল ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
৬. গিলতে সমস্যা:
ভাইরাসজনিত ফ্লুর কারণে গলা ব্যথায় ভোগেন অনেকেই। তবে দীর্ঘদিন ধরে গলায় ব্যথা ও গিলতে সমস্যা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এটি গলা ও খাদ্যনালীর ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে।
৭. রক্তাক্ত মল:
মলের সঙ্গে রক্ত পড়ার সমস্যা ফিসার বা হেমোরয়েডের কারণে হতে পারে, যা সাধারণত চিকিত্সাযোগ্য এবং জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ নয়। তবে পেটে অস্বস্তি ও মলের সঙ্গে রক্ত পড়া কোলন ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে। তাই এই সমস্যাকেও পুরুষরা অবহেলা করবেন না।
৮. আকস্মিক ওজন কমে যাওয়া:
কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে ওজন কমে যাওয়া কিন্তু মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। এটি ডায়াবেটিস, থাইরয়েড, প্রদাহজনক অন্ত্রের রোগ কিংবা বিভিন্ন রোগের কারণ হতে পারে। আবার ওজন কমে যাওয়া বিভিন্ন ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণও হতে পারে। তাই এই সমস্যাটিকেও হেলাফেলা করবেন না।
৯. ক্রমাগত ক্লান্তি:
ক্লান্তি অনেক রোগেরই প্রাথমিক লক্ষণ। সাধারণ সর্দির সমস্যাতেও ক্লান্তি দেখা দেয়। তবে আপনি যদি এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ক্লান্ত বোধ করেন অথবা হঠাৎ শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রমাগত ক্লান্তি লিউকেমিয়া ও লিম্ফোমা ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে।
পুরুষদের উচিত তাদের শরীরের প্রতি আরও বেশি মনোযোগী হওয়া এবং উপরে উল্লেখিত কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্ত করা গেলে, সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ জীবন ফিরে পাওয়া সম্ভব।