ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকেন, তাহলে আজই হোক সাবধান! হতে পারে সমস্যা

বসে থেকেও যে অনেকে মৃত্যুবরণ করতে পারে এই তথ্যটি আমাদের অনেকের একেবারেই অজানা। আর্টিকেলটি তাই সকলকে বিষয়টি জানান দেয়ার জন্য লেখা হয়েছে।

“শুধু বসে থেকে মৃত্যু হতে পারে” গবেষণায় এমন একটি কথা উঠে এসেছে। একটু অবাক হলেন বুঝি? এটাই কিন্তু সত্য। আপনি কি জানেন, শুধুমাত্র বসে থেকেই আপনার মৃত্যু হতে পারে? বসে থাকা অবশ্যই খারাপ কিছু না। কাজ করার তাগিদে আমাদের বসে থাকতে হয় ঘন্টার পর ঘন্টা। বসে থাকা একটি মরণব্যাধি কাজ। আমরা কেউই নিশ্চয়ই অকালে মারা যেতে চাই না। তবে হয়তো নিজের অজান্তেই নিজেকে ক্রমান্বয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছি।

এক্সপার্টরা বলে থাকেন আপনি যতই শরীর ভালো রাখার জন্য ব্যায়াম করুন না কেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকার কারণে আপনার অকালমৃত্যু ঠিকই হবে। এখানে শরীর লিঙ্গ বয়স উচ্চতা কোনকিছুই ম্যাটার করবে না। অনেকক্ষণ বসে থাকা অকালমৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারন। অ্যানালস অফ ইন্টার্নেশনাল মেডিসিনের একটি গবেষণায় বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছে। এখানে ৮০০০ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের উপর একটি গবেষণা করে পরবর্তীতে জানা গিয়েছিল যে দ্রুত মৃত্যুর সঙ্গে অনেকক্ষণ বসে থাকা সরাসরি একটি সম্পর্ক রয়েছে।

অনেকক্ষণ বসে থাকলে শুধু যে মৃত্যু ঝুঁকি বেড়ে যায় তা নয়। শরীরেও দেখা যায় নানা রকম সমস্যা। চলুন জেনে নেয়া যাক ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকার কারনে কি কি সমস্যা হতে পারে-

কাঁধ এবং পিঠে ব্যথা
অনেকক্ষণ ধরে বসে থাকার শরীরের সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হল কাঁধে এবং পিঠে প্রচুর ব্যাথা হতে শুরু করে। অনেকক্ষণ ধরে একই পজিশনে থাকার জন্য শরীর শিথিল হয়ে যায়। ফলে যখন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নাড়ানোর চেষ্টা করা হয়, তখন জায়গাটা ব্যাথা করে ওঠে।

কোলন সমস্যা
অতিরিক্ত বসে থাকার জন্য কোলন সমস্যাও দেখা দেয়। যা পরবর্তীতে টিউমার ও ক্যান্সার এও পরিণত হতে পারে। কোলন ক্যান্সার অবশ্যই খারাপ। তাই এটি প্রতিরোধ করতে হলেও ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকা যাবে না।

ব্রেস্ট এবং এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যান্সার
এই উভয় ক্যান্সারের উপর পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিক প্রভাব অনেকটা নির্ভর করে। অনেকক্ষণ বসে থাকাও এই দুটি ক্যান্সার হওয়ার একটি অন্যতম কারণ।

শারীরিক গঠন নষ্ট হওয়া
অনেকক্ষণ ধরে বসে থাকার জন্য শারীরিক গঠন নষ্ট হয়ে যায়। দেখা গিয়েছে এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকলে শরীর যে রকম শিথিল হয়ে যায় ঠিক সেরকমই বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নানা ধরনের সমস্যা দেখা যায়। পরবর্তীতে একটা সময় গিয়ে শরীরের আকার আকৃতি একেবারে পরিবর্তন হয়ে যায়।

কোমরের ফ্লেক্সিবিলিটি নষ্ট হয়ে যাওয়া
অনেকক্ষণ বসে থাকার কারণে কোমরের ওপরও এর প্রভাব পড়ে। টানা অনেকক্ষণ বসে থাকায় কোমরের ফ্লেক্সিবিলিটি নষ্ট হয়ে যায়।

রক্ত চলাচল কমে যাওয়া
অনেক সময় ধরে বসে থাকার কারণে শরীরের রক্ত চলাচল কমে যায়। অর্থাৎ রক্ত চলাচল পূর্বের তুলনায় কিছুটা ধীর হয়ে যায়। এজন্য ৩০ মিনিট পরপর হাঁটাচলা করা বা দাঁড়িয়ে থাকা উচিত। অন্যথায় রক্ত চলাচল কমে গিয়ে মারাত্মক কিছু একটা হয়ে যেতে পারে।

হৃদরোগ
যেহেতু রক্তসঞ্চালনে কিছুটা ঘাটতি দেখা যায় তাই এর প্রভাব পড়ে হৃদপিন্ডের উপর। ফল স্বরূপ ভুগতে হয় বিভিন্ন হৃদরোগে।

উপরোক্ত সমস্যাগুলো ছাড়াও ফগি ব্রেইন ও শরীরের অন্যান্য অঙ্গ আক্রান্ত হওয়ারও আশঙ্কা থাকে।

আমরা আমাদের বিভিন্ন প্রয়োজনে মোবাইলে কিংবা পড়াশুনার কাজে টেবিল-চেয়ারে আঠার মতো বসে থাকি। স্টুডেন্ট বা কোনো প্রফেশনাল হলে তো কথাই নেই। দিনে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কমপক্ষে ৯ থেকে ১০ ঘন্টা আপনাকে বসে থাকতে হচ্ছে।
কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি ঈর্ভিং মেডিকেল সেন্টার থেকে প্রমাণিত, যারা ৩০ মিনিটের বেশি সময় ধরে বসে থাকে তাদের থেকে ৫৫ শতাংশ কম রিস্কে আছেন যারা ৩০ মিনিটের কম সময়ে পর্যন্ত বসে থেকেছেন। গবেষণায় প্রমাণিত, অনেকক্ষণ বসে থাকলে শরীরে ফ্যাট জমে ও মেটাবলিজম ইস্যু তৈরি হয়।

আপনারা কি জানেন আমরা কেন বসে থাকা এত বেশী অভ্যস্ত হয়ে গেছি?

ছোটবেলা থেকে আমাদেরকে এমন ভাবে বড় করে নেওয়া হয় যে, দাঁড়িয়ে থাকা একটা সাজা এবং বসে থাকা একটা আরাম।

যেমন আপনি যদি কোনো কারণে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন আপনার আশেপাশে থাকা ব্যক্তিবর্গরা বলে উঠবেন “এই তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন? বসে পড়ো?”

আবার ক্লাসে কোনো রকম ভুল করলে দাঁড়িয়ে থাকার শাস্তি প্রদান করা হয়। এক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে একটি এমন ধারণা জন্ম নেয় যে, দাঁড়িয়ে থাকা হলো শাস্তি এবং বসে থাকা হলো আরাম।

ফালে বসে থাকা একটি নীরব ঘাতক জেনেও ব্যাপারটি আমরা কমিয়ে আনতে পারি না। বসে থাকার এই চক্রটি তাই সহজে ভাঙ্গা সম্ভব নয়। আশেপাশে এই ধাঁচের মানুষরা থাকলে তো কোন কথাই নেই। সেই বসে থেকেই অকালে মৃত্যুবরণ করতে হবে দেখা যায়।

এমন পরিস্থিতিতে আপনি কি করতে পারেন
ইতোমধ্যে আপনি জেনে গেছেন বসে থাকা ঠিক কতটা ঝুঁকিপূর্ণ আপনার জন্য। আপনি নিশ্চয়ই এখন আর বসে থেকে নিজের জীবনকে বিপদে ফেলতে চাবেন না। তাই আপনি নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করতে পারেন-

ক্লান্তিকে বলুন বিদায়
অনেকে দাঁড়িয়ে থেকে ক্লান্ত হয়ে যান। কেননা দাঁড়িয়ে থাকার জন্য পায়ের সাপোর্ট এর দরকার হয়। অন্যদিকে বসে থাকার জন্য কোন কিছুর সাপোর্ট লাগে না। ফলে দাঁড়িয়ে থাকলে অনেকেই ক্লান্ত হয়ে যান। তবে ক্লান্ত হয়ে গেলেই হবে না। আপনাকে একটানা কিছুক্ষণ বসে থাকার পর অবশ্যই হাঁটাহাঁটি করতে হবে বা দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হলেও পরবর্তীতে তা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাবে।

চেয়ারকে নিজের শত্রু মনে করুন
এখন থেকে চেয়ারকে বন্ধুর নজরে না দেখে শত্রুর নজরে দেখা শুরু করুন। তার সাথে সুসম্পর্ক নষ্ট করে দিন। যতবারই চেয়ারে বসে থাকার ইচ্ছা জাগবে ততোবারই ঠাস করে দাঁড়িয়ে পড়বেন। খুব কম সময়ে চেয়ারকে দেবেন। ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে যাবে।

সুযোগ খুঁজুন দাঁড়িয়ে থাকার
পাবলিক প্লেসে থাকলে দাঁড়িয়ে থাকার সুযোগ সাধারণত পাওয়াই যায় না। সেটা হতে পারে মিটিং। হতে পারে বন্ধুদের সাথে খেতে যাওয়া ইত্যাদি। তখন অনেকক্ষণ বসে থাকতে হলেও আপনি দাঁড়ানোর সুযোগ খুঁজুন। ধরুন আপনার একটি ফোন কল আসলো। আপনি ফোনটা রিসিভ করার জন্য হলেও সেখান থেকে উঠে গিয়ে আলাদা কোথাও দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কথা বললেন। এতেও কিন্তু আপনার দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা থেকে ব্রেক পাওয়া যায়।

লাঞ্চ ব্রেকটিকে ব্যবহার করুন
অফিসে বা স্কুলে যখন লাঞ্চ ব্রেক বা টিফিন পিরিয়ড চলে, তখন ক্লাসে বসে না থেকে বাহিরে গিয়ে হেঁটে আসুন। এতে সারাক্ষণ কাজের একঘেয়েমিতা যেমন কমবে তেমনি দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার থেকেও কিছুটা ব্রেক পাওয়া যাবে।

মনোযোগ দিন ফিটনেসে
দিনে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটিকে আপনার সঙ্গী বানিয়ে তুলুন। এতে আপনি ফিট থাকবেন।

উপভোগ করুন প্রকৃতিকে
ভোরবেলা কিংবা অনেক সকালে যখন প্রকৃতি স্তব্ধ থাকে এবং পাখিরা কিচিরমিচির আওয়াজে আকাশ বাতাস ভরিয়ে তোলে। তখন প্রার্থনা শেষে বেরিয়ে যান রাস্তায়, ঘুরে আসুন পার্কে বা কোনো ফাঁকা স্থানে। হাঁটতে-হাঁটতে চারপাশ দেখলে মন যেমন ফুরফুরা থাকবে, তেমনি শরীরও ভালো থাকবে।

এভাবেই কোনো না কোনোভাবে বসা থেকে বিরতি নিতে থাকুন। অবশ্যই এই কাজটি আপনার জন্য ভালো।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy