‘SIR’ আতঙ্কে দুর্গাপুরের কাদা রোড যৌনপল্লি, পরিচয়হীন হাজারো যৌনকর্মী চরম অনিশ্চয়তায়

দেশজুড়ে ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (SIR) প্রক্রিয়া শুরু হতেই চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন দুর্গাপুরের কাদা রোড যৌনপল্লির প্রায় হাজারখানেক মহিলা। দুর্গাপুরের রাষ্ট্রায়ত্ত ডিএসপি কারখানার গা-ঘেঁষে প্রায় ৫০ বছর আগে গড়ে ওঠা এই যৌনপল্লির বাসিন্দাদের মুখে এখন একটাই প্রশ্ন—”আমাদের কী হবে? ২০০২ সালের তালিকায় তো আমার নাম নেই, তাহলে এখন যাব কোথায়?”

অনেকেরই বাবা-মা’র সঙ্গে বহু আগে সম্পর্ক শেষ হয়েছে, কেউ কৈশোরে বাড়ি ছেড়েছেন, আবার কাউকে অপহরণ করে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে তাঁদের পক্ষে কমিশনের চাওয়া ২০০২ সালের SIR নথিতে বাবা-মা বা কোনও নিকট আত্মীয়ের নাম খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

রাজ্য ঘুরে ঠিকানা কাদা রোডে

এই যৌনপল্লির অধিকাংশ বাসিন্দা রাজ্যের মুর্শিদাবাদ, মালদা ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে, এমনকি প্রতিবেশী অসম এবং দেশের অন্যান্য রাজ্য ঘুরে দুর্গাপুরে স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে পেয়েছেন। ফলে অনেকেরই এতদিন কোনো পরিচয়পত্র ছিল না, অধিকাংশই কখনও ভোট দেননি।

বাসন্তী মণ্ডল (নাম পরিবর্তিত), বয়স প্রায় ৪০ বছর, তিনি মুর্শিদাবাদ জেলার বাসিন্দা। ১৭ বছর বয়সে কাজের নাম করে রাজস্থানে নিয়ে গিয়ে তাঁকে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সেখান থেকে দিল্লি, কলকাতা হয়ে তাঁর বর্তমান ঠিকানা দুর্গাপুরের কাদা রোড। তাঁর মতো কয়েকশো যৌনকর্মী এদিক-ওদিক ঘুরে এখানে স্থায়ী ঠিকানা পেয়েছেন।

ভোটাধিকার রক্ষায় দুর্বার

বর্তমানে কাদা রোড যৌনপল্লির প্রায় ৮০ শতাংশ বাসিন্দা ভোটার। দুর্গাপুর পুরনিগমের ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত এই যৌনপল্লির বাসিন্দারা ৬৭ ও ৬৮ নম্বর বুথে ভোট দেন। বর্তমান তালিকা অনুযায়ী বিএলও-রা এন্যুমারেশন ফর্ম দিয়ে গেলেও, পুরোনো নথিপত্রের অভাবে তাঁরা গভীর সংকটে।

তবে, এই যৌনকর্মী ও তাঁদের পরিবারকে ভোটাধিকার সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে স্বশাসিত সংস্থা ‘দুর্বার’। সংস্থার কর্মীরা এই মহিলাদের দুঃশ্চিন্তা দূর করতে সবরকম প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।

প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সহ-সভাপতি এবং দুর্বার সংস্থার অন্যতম সদস্য তরুণ রায় বলেন, “যৌনপল্লির মহিলারা চরম আতঙ্কিত। আমরা তাঁদের জন্য দিনরাত এক করে সমস্ত রকম প্রচেষ্টা চালাচ্ছি, কীভাবে একটা নথি তাঁদের জন্য জোগাড় করা যায়। বহু মহিলা যৌনকর্মী বিভিন্ন রাজ্য ঘুরে তারপর দুর্গাপুর এসেছেন। পূর্বে কোথাও ভোটার তালিকাতে তাঁদের নামও নেই। সুতরাং, সমস্যা একটা দেখা দিয়েছে, এটা সত্যি।”

প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া

দুর্গাপুর পুরনিগমের প্রশাসক মণ্ডলীর ডেপুটি চেয়ারপার্সন ধর্মেন্দ্র যাদব বলেন, “এর বিরুদ্ধেই তো আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম। কেন্দ্রীয় সরকার কোনও পরিকাঠামো না-তৈরি করে এরকম বহু যৌনকর্মীকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আমরা ওঁদের পাশে সবরকম ভাবে আছি।”

তবে, দুর্গাপুরের মহকুমা শাসক সুমন বিশ্বাস জানিয়েছেন, “এই বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আমি দ্রুত ওই দু’টি বুথের বিএলও-র সঙ্গে কথা বলছি।” কিন্তু, কাদা রোড যৌনপল্লিতে কান পাতলেই এখন শোনা যাচ্ছে, “আমাদের কী হবে?”—এই অনিশ্চয়তার উত্তর কারও জানা নেই।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy