বিরোধীদের ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বিহারে এক ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে আনল জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (NDA)। একাধিক বুথ ফেরত সমীক্ষার পূর্বাভাসকেও ছাপিয়ে গেছে জয়ের ব্যবধান। এই ফলাফলে মহাজোটের ভরাডুবি হয়েছে, বিশেষত কংগ্রেসের প্রভাব কার্যত শূন্য। যদিও রাষ্ট্রীয় জনতা দল (RJD) একা কিছুটা লড়াই দেখিয়েছে, কিন্তু তারা বিহারকে ‘জঙ্গলরাজ’-এর অভিশাপ থেকে মুক্ত করার তেজস্বী যাদবের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেনি।
এনডিএ-এর এই বিশাল জনাদেশকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিহারের ভোটারদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন এবং স্পষ্ট বলেছেন, বিহারে আর ‘জঙ্গলরাজ’ ফিরবে না।
নীতিশের ‘লাল’ দৌড়, বিজেপি পেল আসনসংখ্যায় চমক
রাজনৈতিক জীবনের সায়াহ্নে এসেও নীতীশ কুমার আরও একবার প্রমাণ করলেন যে তিনিই এখনও বিহারের ‘লাল’ (প্রিয়)। যদিও নীতীশের জনতা দল ইউনাইটেড (JDU) 2020 সালের বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় (৪৩টি আসন) উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি প্রায় ৮৪টি আসন পেয়েছে (এগিয়ে বা জয়ী), তবে এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক দিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)। গতবার ৭৪ আসনে থামা গেরুয়া শিবির এবার ৯০টিরও বেশি আসন (এগিয়ে বা জয়ী) নিশ্চিত করে জোট শরিক JDU-কেও ছাপিয়ে গেছে।
বিপরীতে, গতবারের ফার্স্ট বয় RJD এবার তৃতীয় স্থানে নেমে এসেছে। মহাজোটের এই খারাপ ফল এতটাই প্রকট যে বিরোধী দলনেতার পদ পাওয়ার জন্যও তাদের জোট শরিকদের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রী পদে কি এবার সংশয়? কী করবেন নীতীশ?
NDA জয়ী হলেও মুখ্যমন্ত্রী যে নীতীশ কুমারই হবেন, সেই বিষয়ে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি। বিহারে বিজেপি এর আগে কখনও মুখ্যমন্ত্রী পায়নি। গতবার JDU-এর চেয়ে দ্বিগুণ আসন পেয়েও মুখ্যমন্ত্রীর পদ নীতীশকেই ছেড়ে দিতে হয়েছিল। এবার প্রাপ্ত আসনের নিরিখে বিজেপি নীতীশদেরও ছাপিয়ে যাওয়ায় গেরুয়া শিবিরের একটি বড় অংশ চাইছে না যে এই সুযোগ হাতছাড়া হোক।
যদি মুখ্যমন্ত্রী হতে না পারেন, তবে নীতীশ কুমার NDA-এর অংশ থাকবেন কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই পরিস্থিতিতে ন’বারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কী কৌশল নেন, তার ওপরই নির্ভর করছে বিহারের আগামী দিনের সমীকরণ। চিরাগ পাসোয়ানের এলজেপি এবং এনডিএ-এর অন্য দুই শরিককে নিয়ে সরকার গড়ার কথা ভাবতে পারে বিজেপি। পাল্টা কৌশল হিসেবে RJD এবং আসাদউদ্দিন ওয়েইসির দল আসাদউদ্দিন ওয়েইসির AIMIM-কে সঙ্গে নিয়ে দশমবারের জন্য মসনদে বসার দিকে ঝুঁকতে পারেন নীতীশ।
মহিলাদের ‘নীরব’ ভোটেই বাজিমাত?
প্রচারে ঝড় তুললেও সামান্য দাগও কাটতে পারল না বিরোধীরা। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, উন্নয়ন, সুশাসন এবং মহিলাদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা পৌঁছে দিয়েই নীতীশ বাজিমাত করেছেন। 2020 সালের তুলনায় প্রায় ৭২ লক্ষ বেশি ভোট পড়েছিল, যার একটি বড় অংশই মহিলা ভোটার। নির্বাচন কমিশন আগেই জানিয়েছিল এবার ১২% বেশি মহিলা ভোট দিয়েছেন। ভোটের আগে ৭৫ লক্ষ মহিলার অ্যাকাউন্টে ১০ হাজার টাকা করে দিয়েছিল নীতীশের সরকার। ফলস্বরূপ, মহিলাদের ভোটের সিংহভাগই গেছে শাসকের দিকে। যুবক ও পরিযায়ী শ্রমিকদের ভোট পাবে বলে বিরোধীদের আশা বাস্তবায়িত হয়নি।
তেজস্বী বাঁচলেন নিজের গড়ে, হারলেন তেজপ্রতাপ
গণনার শুরু থেকেই NDA এগিয়ে যায় এবং দুপুরের মধ্যে পাটুলিপুত্রে তাদের বিরাট জয় স্পষ্ট হয়। ব্যক্তিগত লড়াইয়ে, তেজস্বী যাদব নিজের গড় রাঘোপুর কেন্দ্র থেকে শেষ পর্যন্ত জয়ী হলেও, শুরুতে তাকে বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়তে হয়েছিল। অন্যদিকে, লালু পরিবারের বিতাড়িত সদস্য তেজপ্রতাপ যাদব তাঁর মহুয়া কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হয়েছেন। বিজেপির দুই উপ-মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী এবং বিজয় কুমার সিনহা উভয়েই নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। খুনের অভিযোগে জেলে থাকা JDU-এর বাহুবলী প্রার্থী অনন্ত সিং-ও মোকামা থেকে জয়ী হয়েছেন।