লালকেল্লার পর এবার শ্রীনগরের থানায় বিস্ফোরণ, নওগাম ধ্বংসস্তূপে, মৃত ৯! থানায় এত বিপুল বিস্ফোরক রাখা ছিল কেন?

দিল্লির লালকেল্লার কাছে বিস্ফোরণকাণ্ডের তোলপাড়ের মধ্যেই শ্রীনগরের নওগাম থানায় বিস্ফোরণে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। থানা চত্বরে মজুত বিস্ফোরক ফেটে মৃত্যু হয়েছে মোট ৯ জনের। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন তদন্তকারী, স্টেট ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির একজন অফিসার, ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির তিন আধিকারিক, দু’জন শুল্ক আধিকারিক, ক্রাইম উইং-এর একজন ফটোগ্রাফার ও এক দর্জি। এক বিস্ফোরণেই নওগাম থানা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়, ভিতরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল পুলিশ কর্মীদের দেহাংশ।

বিস্ফোরণের কারণ ও প্রশ্ন:

শ্রীনগরে জইশ-ই-মহম্মদ জঙ্গিদের সমর্থনে পোস্টার সাঁটার ঘটনায় আদিল আহমেদ নামে এক চিকিৎসককে গ্রেফতার করে নওগাম থানার পুলিশ। তাঁকে জেরা করেই হরিয়ানার ফরিদাবাদে মজুত বিপুল পরিমাণ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের সন্ধান মেলে। পুলিশের দাবি, বাজেয়াপ্ত সেই বিস্ফোরক ফরিদাবাদ থেকে কাশ্মীরে এনে নওগাম থানা চত্বরের মধ্যে একটি খোলা জায়গায় মজুত রাখা হয়েছিল।

কিন্তু এই ঘটনায় একাধিক গুরুতর প্রশ্ন উঠছে:

  • নিয়মবিরুদ্ধ কাজ: এত বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক হরিয়ানা থেকে কাশ্মীরে আনার আদৌ কি কোনও প্রয়োজন ছিল? কেন শুধু নমুনা সংগ্রহ করে বাকি বিস্ফোরক আগেই ধ্বংস করে দেওয়া গেল না?

  • নিরাপত্তার অভাব: থানার মতো জায়গায় একসঙ্গে এত পরিমাণ বিস্ফোরক রাখাটা কতটা যুক্তিযুক্ত ও নিরাপদ ছিল? বিস্ফোরক আনা হলেও, তার জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা কি করা হয়েছিল?

বিশেষজ্ঞদের প্রতিক্রিয়া:

রাজ্যের প্রাক্তন এডিজি (ADG) নজরুল ইসলাম এই ঘটনায় থানার মারাত্মক গাফিলতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, “বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক থানায় নেওয়াই নিয়মবিরুদ্ধ। প্রয়োজনে নমুনাটুকুই নিত! এটা তো আনারই কথা নয়! বিস্ফোরক প্রতিরোধকারী ব্ল্যাঙ্কেট ব্যবহার করা হল না কেন? কাশ্মীরের মতো একটা জায়গায় অপারেশনের রুলই মানা হয়নি। ওরা সেই নীতি মানেনি। থানা ও পুলিশের গাফিলতি।”

বিএসএফ-এর প্রাক্তন ডিআইজি (DIG) সমীর মিত্র বিস্ফোরণের সময় নিয়ে প্রশ্ন তুলে সাবোটাজের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “অ্যাকশন নেওয়ার দরকার ছিল। এত রাতে…আমি তো সাবোটাজের গন্ধ পাচ্ছি, যে ওটাকে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আপনা থেকে হয়নি। সাবোটাজটা কে করল?”

অন্যদিকে, ব্রিগেডিয়ার প্রণব ঘোষ এটিকে ‘চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট এমন জিনিস, বিশুদ্ধ অবস্থায় বিস্ফোরণ ঘটে না। ফরিদাবাদ থেকে উদ্ধারের সময় রাসায়নিক পরীক্ষা হয়েছিল? হিট দিলে অথবা শক দিলে বিস্ফোরণ হতে পারে। জম্মু ও কাশ্মীরের মতো একটা রাজ্যে তাড়াহুড়ো করা উচিত হয়নি। জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ মূর্খের মতো কাজ করেছে।”

জম্মু কাশ্মীর পুলিশ জানিয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরকের ফরেন্সিক ও রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য গত দু’দিন ধরে নমুনা সংগ্রহের কাজ চলছিল, তখনই দুর্ভাগ্যবশত বিস্ফোরণ ঘটে যায়।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের জম্মু ও কাশ্মীর ডিভিশনের যুগ্ম সচিব প্রশান্ত লোখান্ডে যদিও জানান, নমুনা পরীক্ষা ফরেন্সিক ও রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছিল এবং কী কারণে এই ঘটনা ঘটল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি অন্য কোনো ব্যাখ্যা অনাবশ্যক বলেও মন্তব্য করেন।

রাজনৈতিক চাপানউতোর:

প্রথমে দিল্লিতে বিস্ফোরণ এবং তার চার দিনের মাথায় নওগাম থানায় এই বিস্ফোরণ নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গে সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, “দিল্লির লালকেল্লার সামনে গাড়ি বিস্ফোরণের কয়েকদিনের মধ্যেই এই ঘটনা, কেন্দ্রীয় সরকারের গোয়েন্দা এবং সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলকে যে আরও শক্তিশালী করতে হবে, তারই সতর্কবাণী। এর জবাবদিহি থেকে কেউ পালাতে পারে না।” তৃণমূলের রাজ্য সম্পাদক কুণাল ঘোষ বলেন, “এত বিস্ফোরক কোথা থেকে এল? সেটা আবার রাখতে গিয়ে থানা উড়ে গেল? আইনশৃঙ্খলা কোথায়? পরিকাঠামো কোথায়।”

নওগাম বিস্ফোরণে আহতদের ভারতীয় সেনার বেস হাসপাতাল এবং শের-ই-কাশ্মীর ইন্সটিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেসে ভর্তি করানো হয়েছে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy