মহানায়কের জন্মশতবর্ষে টলিউডের জন্য বিরাট উপহার! মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর বড় ঘোষণায় কি বদলে যাবে বাংলার সিনেমার ভাগ্য?

বাঙালির চিরকালীন আবেগ এবং রূপোলি পর্দার অবিসংবাদিত সম্রাট মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বৃহস্পতিবার এক অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকল তিলোত্তমা কলকাতা। মহানায়কের জন্মশতবর্ষের এই বিশেষ সন্ধিক্ষণে রাজ্যের চলচ্চিত্র শিল্পের সার্বিক উন্নয়ন এবং পরিকাঠামো মজবুত করার জন্য একগুচ্ছ যুগান্তকারী ও বড় ঘোষণা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় টলিউডের প্রথম সারির অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং কলাকুশলীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এক জমকালো মহামিছিলের আয়োজন করা হয়। বর্ষীয়ান অভিনেতা বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়, মহাতারকা মিঠুন চক্রবর্তী থেকে শুরু করে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, জিৎ, চিরঞ্জিৎ এবং রঞ্জিত মল্লিকের মতো বরেণ্য শিল্পীরা এই পদযাত্রায় পা মেলান। নন্দন চত্বর থেকে শুরু হওয়া এই বর্ণাঢ্য মহামিছিল অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস, বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়াম ও নেহেরু চিলড্রেন মিউজিয়াম প্রদক্ষিণ করে গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শশালায় এসে শেষ হয়।
সেখানে মহানায়ক উত্তম কুমারের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান বিশিষ্টজনেরা। রাজ্য সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ছিল একাধিক আকর্ষণীয় চমক। নিউটাউনে একটি অত্যাধুনিক ‘উত্তম কুমার ফিল্ম ইনস্টিটিউট’ গড়ার কথা ঘোষণা করা হয়, যার জন্য ইতিমধ্যেই ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি, রবীন্দ্র সদন ও নন্দন চত্বর চত্বরেও একাধিক নতুন প্রকল্পের কাজ শুরু হতে চলেছে। শুধু তাই নয়, আগামী দিনে রাজ্যের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে মহানায়কের সমস্ত ক্লাসিক ও ব্লকবাস্টার হিট ছবিগুলি পুনরায় প্রদর্শনের বিশেষ ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন খোদ মহানায়কের পরিবারের সদস্যরাও। তাঁদের নিজ হাতে পায়েস খাইয়ে এই বর্ণাঢ্য জন্মশতবর্ষ উদযাপনের শুভ সূচনা করা হয়।
অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল মঞ্চে দাঁড়িয়ে টলিউডের ঐক্যের ডাক দিয়ে মহাতারকা মিঠুন চক্রবর্তীর জোরালো বক্তব্য। টলিপাড়ার সমস্ত অন্তর্দ্বন্দ্ব ও অভিমান ভুলে একে অপরের হাত ধরে একজোট হওয়ার জোরালো আহ্বান জানান তিনি। আবেগঘন কণ্ঠে মিঠুন বলেন, “আমাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই, কোনো সংকীর্ণতা নেই, কোনো বাধা নেই। অতীতে কে কী বলেছিলাম, সব ভুলে গিয়েছি। আজকের দিনটি শুধু এবং কেবলই উত্তম কুমারের। আমাদের লক্ষ্য হলো বলিউডকে কড়া টক্কর দেওয়া এবং টলিউডকে তার হারানো সোনালী দিনে ফিরিয়ে আনা।” অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবসময় ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করার বার্তা দিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, অন্যায়কারী ও অত্যাচারীকে কস্মিনকালেও ক্ষমা করা উচিত নয়।
মিঠুনের এই বক্তব্যের মাঝেই অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে উঠে আসে টলিউডের জন্য দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত ভর্তুকির প্রসঙ্গ। তিনি সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে বাংলার সিনেমার উন্নতির স্বার্থে ৩০ শতাংশ সাবসিডি বা ভর্তুকির দাবি জানান। এই প্রস্তাব পাওয়া মাত্রই মুখ্যমন্ত্রী তাতে তৎক্ষণাৎ সম্মতি দেন। মিঠুন নিজেই সেই সুসংবাদ সকলের সামনে ঘোষণা করে বলেন, “দাদা সঙ্গে সঙ্গেই বলেছেন—ইট শ্যাল বি ডান!” তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে এই ভর্তুকি সরাসরি নগদে প্রদান করা হবে না, বরং ছবির মানোন্নয়নে কাজে লাগবে। এছাড়া অনুষ্ঠানে রাজ্য সরকারের পাশাপাশি কেন্দ্রের ভূমিকারও ভূয়সী প্রশংসা করেন মিঠুন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে মহানায়ককে নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “আমরা প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। কোনো রাজনৈতিক দলের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়, বরং বাংলা থেকে কেউ প্রধানমন্ত্রীকে না বললেও তিনি নিজে থেকেই মহানায়ককে সম্মানিত করেছেন।”
সবমিলিয়ে, মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষের এই মহোৎসব শুধু কলকাতা বা রাজ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভেরিফায়েড সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে মহানায়ককে শ্রদ্ধা জানিয়ে পোস্ট করায় তা বিশ্বমঞ্চে ছড়িয়ে পড়েছে। অনুষ্ঠানের সফল রূপায়ণে প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি ডঃ সৌমিত্র মোহনের নিরলস ভূমিকারও অকুণ্ঠ প্রশংসা করেন মিঠুন চক্রবর্তী। পরিশেষে, এই জমকালো আয়োজন ও ঐতিহাসিক ঘোষণাগুলির মাধ্যমে টলিউড যেন তার পুরনো গৌরব ও সোনালী দিনগুলোকে ফিরে পাওয়ার এক নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।