চুল পড়ার সমস্যায় কমবেশি অনেকেই ভোগেন। আর এই সমস্যা সমাধানে না জেনে বাজারচলতি বিভিন্ন প্রসাধনী ব্যবহার করে লাভের চেয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হন অনেকেই। কারণ চুল পড়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। সেই কারণগুলো সঠিকভাবে না জেনে বিভিন্ন তেল, শ্যাম্পু বা সিরাম ব্যবহার করলে চুল পড়ার সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
বংশগত কারণ ছাড়াও পুষ্টির অভাব, হরমোনের পরিবর্তন এমনকি কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও চুল পড়তে পারে। তাই চুল পড়ার সঠিক সমাধানের জন্য প্রথমে জানতে হবে আপনার অতিরিক্ত চুল ঝরার আসল কারণটি কী। চলুন জেনে নেওয়া যাক চুল পড়ার ৭টি প্রধান কারণ ও তার সমাধানের উপায়:
১. হরমোনের পরিবর্তন ও চিকিৎসা অবস্থা:
নারীদের মেনোপজের সময় হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে অতিরিক্ত চুল পড়তে পারে। ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়ায় পুরুষ হরমোন অ্যান্ড্রোজেনের প্রভাব বাড়ে। এর ফলে মেনোপজের সময় ও পরে চুলের ফলিকল সংকুচিত হয় এবং চুল পাতলা হয়ে যেতে পারে।
সমাধান: এই সমস্যার সমাধানে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। হরমোনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করুন এবং সুষম খাদ্য গ্রহণ নিশ্চিত করুন।
২. পুষ্টির ঘাটতি:
শরীরে বায়োটিনের অভাব হলে চুল দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে যায়। পর্যাপ্ত ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল ও শাকসবজি না খেলে শরীর আয়রন শোষণ করতে পারে না। আয়রনের ঘাটতি চুল পড়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।
সমাধান: চুল পড়া কমাতে হলে অবশ্যই পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। খাদ্যতালিকায় ভিটামিন, মিনারেলস ও আয়রন সমৃদ্ধ খাবার যোগ করুন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে পারেন।
৩. মানসিক ও শারীরিক চাপ:
অতিরিক্ত মানসিক ও শারীরিক চাপ টেলোজেন এফ্লুভিয়াম নামক একটি অবস্থার সৃষ্টি করে, যার ফলে অস্বাভাবিকভাবে চুল পড়ে। স্ট্রেসের কারণে চুলের ফলিকলের কার্যকারিতা কমে যায় এবং আক্রান্ত চুলগুলো ঝরে পড়তে শুরু করে।
সমাধান: এই সমস্যা সমাধানে মেডিটেশন, নিয়মিত ব্যায়াম এবং একটি স্বাস্থ্যকর কর্ম-জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখুন। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলুন। পর্যাপ্ত ঘুমও এক্ষেত্রে জরুরি।
৪. জেনেটিক্স (বংশগত চুল পড়া):
বংশগতভাবে চুল পড়ার প্রবণতা থাকলে, যাকে অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়া বলা হয়, সময়ের সাথে সাথে মাথায় টাক পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। পুরুষদের ক্ষেত্রে ২০ বা ৩০ বছর বয়স থেকেই এই সমস্যা শুরু হতে পারে।
সমাধান: আপনার পরিবারে যদি কারও চুল পড়ে টাক হওয়ার ইতিহাস থাকে, তাহলে এই সমস্যা এড়াতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মিনোক্সিডিল ও ফিনাস্টেরাইডের মতো ওষুধ গ্রহণ করে বংশগত চুল পড়ার গতি কমানো যেতে পারে।
৫. কিছু ওষুধ ও চিকিৎসা:
বিটা-ব্লকার, ব্লাড থিনার, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টস, কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ, কিছু ননস্টেরয়েডাল অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগস, থাইরয়েড ওষুধ, হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি বা স্টেরয়েডের মতো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও চুল পড়তে পারে।
সমাধান: যদি আপনি সন্দেহ করেন কোনো ওষুধ আপনার চুল পড়ার কারণ হচ্ছে, তাহলে বিকল্প ওষুধ বা সমাধানের জন্য আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন।
৬. চুলে ক্ষতিকর প্রসাধনীর ব্যবহার:
স্টাইলিং সরঞ্জাম (যেমন – হেয়ার ড্রায়ার, স্ট্রেইটনার) এর অতিরিক্ত ব্যবহার, চুলের বিভিন্ন রাসায়নিক চিকিৎসা (যেমন – কালার, রিবন্ডিং) এবং খুব টাইট করে চুল বাঁধার কারণে চুলের ক্ষতি হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত চুল দুর্বল হয়ে ভেঙে ঝরে যায় এবং চুল রুক্ষ্ম হয়ে পড়ে।
সমাধান: প্রাকৃতিক উপায়ে চুলের যত্ন নিন এবং ক্ষতিকর প্রসাধনীর ব্যবহার এড়িয়ে চলুন। চুলে হিট দিয়ে স্টাইল করার অভ্যাস কমান, আঁটসাঁট চুলের স্টাইল পরিহার করুন এবং আপনার চুলের ধরন অনুযায়ী সঠিক পণ্য ব্যবহার করুন।
৭. অটোইমিউন রোগ:
অ্যালোপেসিয়া অ্যারেটা নামক অটোইমিউন রোগের কারণে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, যার ফলে চুলের ফলিকলে খারাপ প্রভাব পড়ে এবং অতিরিক্ত চুল ঝরে। এই রোগ শরীরের যেকোনো স্থানের চুল পড়ার কারণ হতে পারে, তবে সাধারণত মাথা ও মুখেই বেশি দেখা যায়।
সমাধান: এই সমস্যার সমাধানে কর্টিকোস্টেরয়েড, ইমিউনোথেরাপি বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করতে পারেন।
চুল পড়ার সমস্যা সমাধানে সঠিক কারণ জানা এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা বা যত্ন নেওয়া অপরিহার্য। না জেনে ভুল প্রসাধনী ব্যবহার করে আপনার চুলের আরও ক্ষতি হতে পারে। তাই চুল পড়ার সমস্যায় পড়লে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।