ইস্ট-মোহন ডার্বির সেই ১৭ মিনিটের জাদু! আজ কোথায় হারিয়ে গেলেন লাল-হলুদের ত্রাতা এডমুন্ড?

ইস্ট-মোহন ডার্বির মাঠ সব সময়ই জন্ম দেয় নতুন তারার। আবার সেই তারার আলোই কখনও মাঝ আকাশ থেকে খসে পড়ে চিরতরে। ২০২০ সালের এমনই এক রোমাঞ্চকর ডার্বি দেখেছিল বাংলা ফুটবল, আর সেই মঞ্চেই জন্ম নিয়েছিল নতুন এক তারকা—এডমুন্ড লালরিনডিকা।

তখন ইস্টবেঙ্গলের মূল দায়িত্বে ছিলেন কোচ আলেয়ান্দ্রো মেনেন্দেজ, আর তাঁর বিশ্বস্ত সহকারী ছিলেন মারিও রিভেরা। সময়ের ফেরে মারিও রিভেরা এখন তানজানিয়ায় অনূর্ধ্ব-২০ দলের সঙ্গে কাজ করছেন, কিন্তু কলকাতার সেই ঐতিহাসিক ডার্বি এবং এডমুন্ডের পায়ের জাদু আজও তাঁর মনের গভীরে গেঁথে রয়েছে। সম্প্রতি ডুরান্ড কাপের ফাইনালে মোহনবাগানকে বড় ব্যবধানে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ইস্টবেঙ্গল। সেই ম্যাচের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স এবং এডমুন্ডের অতীতের নায়কোচিত মুহূর্তগুলো আজও ফুটবলপ্রেমীদের মুখে মুখে ফিরছে। তানজানিয়া বসেই এডমুন্ডের সেই সোনালী দিনের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন মারিও রিভেরা।

তরুণ এই প্রতিভাকে অতীতে খুব কাছ থেকে দেখেছেন রিভেরা। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি বলেন, “দীর্ঘ চোটের পর এডমুন্ড যেদিন প্রথমবার দলের সঙ্গে অনুশীলনে ফিরেছিল, সেই দিনটার কথা আমি এখনও পরিষ্কার মনে করতে পারি। মাঠে নামার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই স্পষ্ট বোঝা গিয়েছিল যে ওর গেম রিডিং অন্য এক উচ্চ স্তরের।” রিভেরার চোখে এডমুন্ডের সবচেয়ে বড় গুণ শুধু বল পায়ে তাঁর সহজাত দক্ষতা নয়, বরং বল ছাড়াও তিনি যে নিখুঁতভাবে খেলা পড়তে পারেন, সেটাই তাঁকে বাকিদের থেকে আলাদা করে দেয়।

রিভেরা আরও বলেন, “বল ছাড়া ওর পজিশনিং এবং মুভমেন্ট অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত। সবসময় সঠিক সময়ে সঠিক ফাঁকা জায়গায় নিজেকে মেলে ধরে ও। এমনকি বল পায়ে পাওয়ার আগেই পরবর্তী অ্যাকশন কী হবে, তা মানসিকভাবে ঠিক করে ফেলে এডমুন্ড। ডিফেন্ডার কী করতে চলেছে, তা আগে থেকেই আন্দাজ করার এক অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে ওর মধ্যে।”

২০২০ সালের সেই স্মরণীয় ম্যাচে ৫৯ মিনিটের মাথায় পিন্টু মাহাতোর পরিবর্তে বদলি হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন এডমুন্ড। সেই মুহূর্তে ইস্টবেঙ্গল ১-০ গোলে পিছিয়ে ছিল। মাঠে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই মোহনবাগান ব্যবধান বাড়িয়ে ২-০ করে ফেলে। কিন্তু খেলার মোড় ঘুরে যায় অন্য দিকে। ৭১ মিনিটে এডমুন্ডের সেই বিখ্যাত ফুটবল-বুদ্ধি ফের সকলের নজর কাড়ে। একটি নিখুঁত ও অসাধারণ পাস বাড়ান তিনি মার্কোস এসপাডার উদ্দেশে। এডমুন্ডের সেই জাদুকরী পাস ধরে এসপাডা পরাস্ত করেন প্রতিপক্ষ গোলরক্ষক শঙ্কর রায়কে, আর এর মাধ্যমেই ম্যাচে ফেরার রাস্তা খুঁজে পায় ইস্টবেঙ্গল। যদিও গোল করার কিছু মিনিট পরেই মারাত্মক চোটের কারণে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন এডমুন্ড। শেষ পর্যন্ত ওই ম্যাচ ২-১ গোলে হেরে গেলেও ফলাফলের আড়ালে জন্ম নেয় এক নতুন ইতিহাস।

সেদিন মাঠে এডমুন্ডের মধ্যে এমন এক আগুন দেখেছিলেন লাল-হলুদ সমর্থকরা, যা সাধারণ ১৭ মিনিটের পারফরম্যান্স দিয়ে মাপা যায় না। কর্নার নিতে যাওয়ার সময় তাঁর সেই চরম উন্মাদনা এবং গোটা স্টেডিয়ামকে জাগিয়ে তোলার দৃশ্য আজও সমর্থকদের মনে অমর হয়ে রয়েছে। ইস্টবেঙ্গলের শীর্ষকর্তা দেবব্রত সরকার সেদিনই মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, “এই ছেলেটার রক্তে ইস্টবেঙ্গলের আগুন রয়েছে।”

পরবর্তী সময়ে বারবার চোট এডমুন্ডের ফুটবলজীবনকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু প্রতিবারই তিনি দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে ফিরে এসেছেন। আর এই অদম্য মানসিকতাই মারিও রিভেরাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে।