সূর্য ডুবলেও শান্তি নেই! নিজের ঘরেই কেন তৈরি হচ্ছে ‘নরক’? আসল কারণ জানলে চমকে উঠবেন

বাইরে চড়া রোদ, লু হাওয়া আর ৪0 ডিগ্রির ওপর তাপমাত্রা। দুপুরবেলার এই নরকযন্ত্রণা সহ্য করার পর অনেকেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন সূর্যাস্তের। ভাবেন, সূর্যটা ডুবলেই বুঝি একটু ঠান্ডা হাওয়া মিলবে, স্বস্তি ফিরবে ঘরে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ঠিক উল্টোটা। সন্ধে পেরিয়ে রাত বাড়লেও ঘরের মধ্যে ভ্যাপসা গরম কমছে না, বরং গুমোট ভাব আরও বাড়ছে। বিছানায় পিঠ ঠেকানো দায় হয়ে পড়ছে, ফ্যানের হাওয়া যেন গায়ে আরও বেশি করে আগুনের হলকা ছড়াচ্ছে।

দিন তো বটেই, ইদানীং ভারতের শহর ও শহরতলির রাতগুলোও কেন এতটা ভয়ানক হয়ে উঠছে? কেন সূর্যাস্তের পরও নিজের ঘরে টেকা দায় হচ্ছে? আবহাওয়াবিদ এবং সাম্প্রতিক পরিবেশ গবেষণায় এর পেছনে মূল কিছু কারণ উঠে এসেছে।

দেওয়াল থেকে বেরোচ্ছে ‘লুকানো’ আগুন সম্প্রতি ‘ক্লাইমেট ট্রেন্ডস’-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতীয় বাড়িগুলোতে গরমের দিনে সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হচ্ছে রাত ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে। এমনকি মাঝরাতেও ঘরের তাপমাত্রা ৩৪ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামছে না। এর প্রধান কারণ আমাদের বাড়ি তৈরির উপাদান। আধুনিক কংক্রিট এবং ইটের বাড়িগুলো সারাদিন ধরে সূর্যের তীব্র তাপ শোষণ করে নেয়। একে বলা হয় ‘থার্মাল মাস’। সূর্যাস্তের পর যখন বাইরের পরিবেশ কিছুটা ঠান্ডা হতে শুরু করে, তখন এই কংক্রিটের ছাদ ও দেওয়ালগুলো সারাদিনে জমিয়ে রাখা তাপ ঘরের ভেতরে ছাড়তে শুরু করে। ফলে বাইরে হাওয়া থাকলেও ঘরের ভেতরটা চুল্লির মতো গরম হয়ে থাকে।

শহুরে ‘হিট আইল্যান্ড’ এবং হারিয়ে যাওয়া হাওয়া শহরাঞ্চলে ঘিঞ্জি বহুতল, গাছপালার অভাব এবং যত্রতত্র কংক্রিটের রাস্তার কারণে তৈরি হচ্ছে ‘আর্বান হিট আইল্যান্ড’ বা শহুরে তাপদ্বীপ। গ্রাম বা খোলা মেলা এলাকায় রাতে ফাঁকা জমি দ্রুত তাপ বিকিরণ করে ঠান্ডা হয়ে যায়। কিন্তু শহরে গাছপালা না থাকায় এবং বহুতলগুলো খুব কাছাকাছি হওয়ায় বাতাস চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দিনের বেলা জমে থাকা তাপ রাতের বাতাসে আটকে পড়ে, পরিবেশ শীতল হওয়ার সুযোগই পায় না।

জলীয় বাষ্পের ফাঁদ গরমের সঙ্গে যখন বাতাসে জলীয় বাষ্প বা আর্দ্রতা (Humidity) বেশি থাকে, তখন পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। আর্দ্রতা বেশি থাকলে আমাদের শরীরের স্বাভাবিক শীতলীকরণ প্রক্রিয়া অর্থাৎ ঘাম হওয়া এবং তা বাতাসে শুকিয়ে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। ত্বক চটচটে হয়ে থাকে কিন্তু শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা কমে না। এই গুমোট অবস্থায় ঘরের সিলিং ফ্যান চালালে তা কেবল ঘরের ওই গরম ও আর্দ্র বাতাসকেই চারদিকে ঘুরিয়ে দেয়, যা আরাম দেওয়ার বদলে অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে তোলে।

এসি-ও কেন হার মানছে? অনেকের ধারণা এসি চালালেই এই সমস্যার সমাধান। কিন্তু চিকিৎসকেরা বলছেন, ঘরের দেওয়াল আর ছাদ যদি ২৪ ঘণ্টাই গরম থাকে, তবে এসি বন্ধ করার সাথে সাথেই সেই ঘর আবার তপ্ত হয়ে ওঠে। এই টানা গরম মানুষের ঘুমের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। শরীর রাতে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ না পাওয়ায় মানুষ ক্লান্তি, মাথাব্যথা এবং ডিহাইড্রেশন নিয়ে ঘুম থেকে উঠছে।

বাঁচার উপায় কী? এই গুমোট গরম থেকে বাঁচতে ঘরের জানালা-দরজায় ‘ক্রস ভেন্টিলেশন’ বা হাওয়া চলাচলের ব্যবস্থা রাখা জরুরি। বিকেলের দিকে ঘরের দেওয়াল বা ছাদে জল ছেটাতে পারলে ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা কিছুটা কমে। এছাড়া ঘুমানোর আগে হালকা গরম জলে স্নান করলে শরীরের তাপমাত্রা সাময়িকভাবে কমে, যা রাতে কিছুটা ভালো ঘুমাতে সাহায্য করতে পারে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy