শনিবার সাতসকালে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তী বিধানসভার চড়াবিদ্যা এলাকায় এক চাঞ্চল্যকর অভিযানে নামল রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF)। এলাকার দাপুটে তৃণমূল নেতা ও পঞ্চায়েত প্রধানের স্বামী রমজান মোল্লার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে তাঁকে গ্রেফতার করলেন গোয়েন্দারা। রমজানের বাড়িতে আগ্নেয়াস্ত্র মজুত থাকার অভিযোগ ছিল। শুধু তাই নয়, রমজানকে জেরা করে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এরপর এসটিএফ সন্দেশখালিতে হানা দেয়। সেখানে এক পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয় আরও আগ্নেয়াস্ত্র, যা এই ঘটনার গভীরতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কে এই রমজান মোল্লা? কেনই বা তার দিকে গোয়েন্দাদের এত নজর? স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একদা বাম আমলের দাপুটে নেতা শবদেল মোল্লার ভাই এই রমজান। ২০০৩ সালে দাদার হাত ধরেই রাজনীতির ময়দানে হাতেখড়ি। শুরুতে সিপিএমের ছত্রছায়ায় থাকলেও, ২০১১ সালে রাজ্যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তিনি এবং তাঁর দাদা দলবদল করে তৃণমূলে যোগ দেন। গোসাবার বিধায়ক জয়ন্ত নস্করের হাত ধরে তৃণমূলে নাম লেখানোর পর ২০১৩ সালে রমজান পঞ্চায়েত সদস্য হন। এরপর থেকে তাঁর উত্থান ছিল রুদ্ধশ্বাস।
গোয়েন্দা সূত্রের খবর, রমজানের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল সন্দেশখালির কুখ্যাত নেতা শেখ শাহজাহানের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বা শ্যালক হিসেবে। অভিযোগ, চড়াবিদ্যার স্থানীয় যেকোনো বিবাদ বা সমস্যা হলে রমজান তা সরাসরি শাহজাহানের দরবারে নিয়ে যেতেন। শাহজাহানের নাম ভাঙিয়ে এলাকায় সাধারণ মানুষের ওপর দিনের পর দিন অত্যাচার চালানোর অভিযোগ রয়েছে রমজানের বিরুদ্ধে। স্থানীয় বিধায়ক শওকত মোল্লার সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতার কথা সুবিদিত ছিল। ২০২০ সালের পর থেকে তিনি বাসন্তীর আরেক দাপুটে নেতা রাজা গাজির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করেন।
রমজানের এই কয়েক বছরের উত্থান সাধারণের কল্পনাতীত। মাত্র কয়েক বছরের রাজনৈতিক আশ্রয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। গোয়েন্দা তদন্তে উঠে এসেছে, তিনটি বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে তাঁর—যার মধ্যে একটি বাসন্তীর ৮ নম্বর কুমড়ামারি এলাকায় এবং অপরটি সন্দেশখালির সরবেড়িয়া আকুঞ্জি মার্কেট এলাকায়। এছাড়া, তাঁর দখলে রয়েছে প্রায় দেড়শো বিঘারও বেশি ফিশারি। এত বিশাল সম্পত্তি একজন পঞ্চায়েত প্রধানের স্বামীর আয়ের উৎসের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিরোধীরা।
এসটিএফ-এর এই অভিযানে বাসন্তীর রাজনৈতিক মহলে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছে। শাহজাহান-যোগ এবং অস্ত্র কারবারের এই নতুন মোড় শাসক দলের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সন্দেশখালি ঘটনার পর একের পর এক এভাবে অস্ত্র কারবারিদের গ্রেফতার হওয়া প্রমাণ করে যে, স্থানীয় অপরাধীদের সঙ্গে রাজ্যের অপরাধ জগতের এক অশুভ আঁতাত দীর্ঘকাল ধরে সক্রিয় ছিল। রমজান মোল্লাকে জেরা করে আরও কত বড় চক্রের হদিশ পাওয়া যায়, এখন সেদিকেই নজর তদন্তকারীদের।





