টলিপাড়ার বাতাসে এখন বদলের হাওয়া। রাজনৈতিক পালাবদলের ঠিক পরেই বুধবার টেকনিশিয়ান্স স্টুডিওয় আয়োজিত এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক যেন টলিউডের জমে থাকা যাবতীয় ক্ষোভের অগ্নিকুণ্ড হয়ে উঠল। অভিনেতা-বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষের আহ্বানে আয়োজিত এই বৈঠকে পরিচালক, প্রযোজক থেকে শুরু করে টেকনিশিয়ান গিল্ডের প্রতিনিধিরা জড়ো হয়েছিলেন। আর সেই মঞ্চেই অতীতের এক বিতর্কিত অধ্যায় টেনে এনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এলেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়।
ফেডারেশনের সঙ্গে সংঘাতের জের ধরে কয়েক মাস আগে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে দেখা গিয়েছিল পরমব্রতকে। সেই ঘটনার নেপথ্যে থাকা তীব্র মানসিক যন্ত্রণার কথা এদিন প্রথমবার প্রকাশ্যে আনলেন তিনি। অভিনেতা বলেন, “সেদিন আমার সদ্যজাত সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষমা চেয়েছিলাম। আর কোনো উপায় ছিল না।” তাঁর এই স্বীকারোক্তি মুহূর্তেই স্তব্ধ করে দেয় উপস্থিত সকলকে। পরমব্রত স্পষ্ট করে দেন যে তিনি ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে আসেননি, বরং ইন্ডাস্ট্রির মানুষদের আপন ভেবেই নিজের অপমানবোধের কথা ভাগ করে নিয়েছেন। পাশে বন্ধু রুদ্রনীলকে বসিয়ে তিনি আরও বলেন, “রুদ্র এবং আমার মধ্যে মতপার্থক্য অনেক, কিন্তু আমরা কখনো রাজনীতিকে আমাদের সম্পর্কের মধ্যে ঢুকতে দিইনি। টলিউডেও এখন ঠিক এই সহনশীলতারই প্রয়োজন।”
বুধবারের বৈঠকে শুধুমাত্র পরমব্রতই নন, বহু টেকনিশিয়ানও তাঁদের দীর্ঘদিনের হেনস্তার কথা তুলে ধরেন। কাজের ক্ষেত্রে নিয়মিত চাপ, ভয় দেখানো, এমনকি প্রাণনাশের হুমকির মতো গুরুতর অভিযোগও উঠে আসে। অনেকের দাবি, মতের অমিল হলেই তাঁদের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ফেডারেশনের সঙ্গে সংঘাতের জেরে এক সময় অনির্বাণ ভট্টাচার্য, সৃজিত মুখোপাধ্যায় এবং জয়দীপ মুখোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বরাও চরম অস্বস্তির মুখে পড়েছিলেন।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সৃজিত মুখোপাধ্যায়, ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত, ফিরদৌসল হাসান ও সৌরভ দাসের মতো ব্যক্তিত্বরা। ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় নতুন ফেডারেশন গঠন ও শক্তিশালী প্রযোজক গিল্ড তৈরির দাবি জোরালো হয়। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের কথায়, “সমস্যার সমাধান একতরফা সম্ভব নয়, আলোচনার টেবিলেই পথ খুঁজতে হবে।” অন্যদিকে, প্রযোজক ফিরদৌসল হাসান বলেন, বাংলায় সংগঠিত প্রযোজক মঞ্চের অভাবই বর্তমান সমস্যার মূল কারণ।
সবশেষে রুদ্রনীল ঘোষ জানান, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে টলিউডের প্রতিটি সমস্যা তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের কাছে তুলে ধরা হবে। তিনি তথাকথিত ‘গুপী শুটিং’ প্রথা বন্ধ করার পক্ষেও সওয়াল করেন। “রাজনৈতিক মত যার যার, কিন্তু কাজ সবার”—এই মন্ত্রেই টলিউডের আগামী দিনগুলি সাজাতে বদ্ধপরিকর এই মঞ্চ। তবে বুধবারের এই বৈঠকের পর টালিগঞ্জের ক্ষমতার অলিন্দে এখন একটাই প্রশ্ন—ফেডারেশনের একচ্ছত্র আধিপত্যের দিন কি শেষ হতে চলেছে? উত্তর লুকিয়ে রয়েছে আগামীর সমীকরণে।





