ভারতের বিচারবিভাগীয় ইতিহাসে প্রজনন স্বাস্থ্যের অধিকার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্নে এক যুগান্তকারী ও মানবিক রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে সাত মাসেরও বেশি সময়ের (২৮ সপ্তাহ) গর্ভাবস্থা অবসানের অনুমতি দিয়ে শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিল—কোনো নারী, বিশেষ করে তিনি যদি নাবালিকা হন, তবে তাঁকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ চালিয়ে যেতে বাধ্য করা যায় না।
মৌলিক অধিকার ও প্রজনন স্বায়ত্তশাসন:
শুক্রবার বিচারপতি বি. ভি. নাগরত্ন এবং বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়ার সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করে। আদালত পর্যবেক্ষণে জানায়, সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং গোপনীয়তার যে মৌলিক অধিকার রয়েছে, নিজের শরীরের ওপর অধিকার বা প্রজনন স্বায়ত্তশাসন তারই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোনো ব্যক্তিকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে মা হতে বাধ্য করা মানেই হলো তাঁর এই মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন।
আদালতের কঠোর ও মানবিক পর্যবেক্ষণ:
বিচারপতিদের বেঞ্চ স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, “কোনও আদালতই কোনও নারীকে, বিশেষ করে একজন নাবালিকাকে, তাঁর স্পষ্ট ইচ্ছার বিরুদ্ধে পূর্ণ সময় পর্যন্ত গর্ভধারণের জন্য বাধ্য করতে পারে না।” শুনানির সময় গর্ভাবস্থা পূর্ণ করে শিশুকে দত্তক দেওয়ার একটি যুক্তি উঠলেও আদালত তা সরাসরি খারিজ করে দেয়। আদালতের মতে, গর্ভবতী ব্যক্তির অধিকার ও কল্যাণের ওপর অন্য কোনো বিবেচনা প্রাধান্য পেতে পারে না।
ঝুঁকি ও মানসিক স্বাস্থ্য:
আদালত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছে। আইনি অনুমতি না দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অসুরক্ষিত বা অবৈধ উপায়ে গর্ভপাতের পথ বেছে নিতে পারেন, যা তাঁদের জীবনের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। এই নির্দিষ্ট মামলার ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে যে, ওই কিশোরী এই গর্ভাবস্থাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বলে বর্ণনা করেছিল এবং মানসিক ট্রমার জেরে সে নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার চেষ্টাও করেছিল। কিশোরীর মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক অবস্থানের কথা মাথায় রেখেই শীর্ষ আদালত এই মানবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই রায় পুনরায় নিশ্চিত করল যে, সামাজিক রীতি নয়, বরং ব্যক্তির মর্যাদা ও স্বায়ত্তশাসনই হবে বিচারের মূল মাপকাঠি।





