ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড সাধারণত রাজনৈতিক উত্তাপের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত হলেও, ২০২৬ সালের বকরি ইদের সকালে তা সাক্ষী থাকল এক ভিন্নধর্মী সম্প্রীতির দৃশ্যের। বহু দশকের চেনা ঐতিহ্য ভেঙে এদিন কলকাতার রেড রোডের পরিবর্তে ব্রিগেডের উন্মুক্ত প্রান্তরেই সমবেত হলেন প্রচুর মানুষ। ইদের নমাজ পাঠের মধ্য দিয়ে শহর যেন এক নতুন একতার বার্তা দিল।
দীর্ঘদিন ধরে কলকাতার রেড রোড ছিল ইদের নমাজের প্রধান কেন্দ্র। রাজভবন ও সেনা সদরের মাঝে অবস্থিত এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কে প্রতি বছরই লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হতো। তৃণমূল জমানায় এই নমাজ কেবল ধর্মীয় উৎসবে সীমাবদ্ধ না থেকে রাজনৈতিক বড় মঞ্চে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু নিরাপত্তার খাতিরে সেনাবাহিনীর আপত্তির জেরে এবং রাজ্যে নতুন সরকারের কঠোর প্রশাসনিক অবস্থানের ফলে সেই চেনা রেওয়াজ এবার ইতিহাস হয়ে গেল। বর্তমানে কলকাতার রাস্তায় নমাজ পড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেবল রেড রোড নয়, শুক্রবারের জুম্মার নমাজও এখন মসজিদেই সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন পুণ্যার্থীরা।
সরকারের কড়াকড়ি কেবল নমাজের স্থান নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ নেই, বকরি ইদের কুরবানির নিয়মবিধিতেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। গত ১৩ মে রাজ্য সরকারের জারি করা এক বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, শংসাপত্র ছাড়া গরু, বাছুর বা মোষ জবাই করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই প্রক্রিয়া শুধুমাত্র অনুমোদিত কসাইখানাতেই সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। প্রকাশ্য স্থানে পশু জবাইয়ের বিরুদ্ধেও নেওয়া হয়েছে কঠোর অবস্থান। প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী নাখোদা মসজিদ কর্তৃপক্ষও। মসজিদ কর্তৃপক্ষের মতে, অন্য ধর্মের মানুষদের অস্বস্তি না ঘটিয়ে উৎসব পালন করাই শ্রেয়, কারণ ইসলামে গরু কুরবানি কোনো বাধ্যতামূলক প্রথা নয়।
সরকারি এই নিয়মবিধির প্রভাব স্পষ্ট দেখা গেছে উত্তর কলকাতার গরু বিক্রির হাটগুলোতে। উৎসবের আগের দিনগুলোতেও হাট ছিল কার্যত শুনশান। বিক্রেতারা খদ্দেরের অপেক্ষায় বসে থেকেও নিরাশ হয়েছেন। আইন মেনে চলার মানসিকতা এবং ধর্মীয় সচেতনতায় এবার অধিকাংশ এলাকাতেই প্রকাশ্য কুরবানির প্রবণতা ছিল না বললেই চলে।
এত বিধিনিষেধ আর কড়াকড়ির মধ্যেও বকরি ইদের চিরন্তন আনন্দের ছিটেফোঁটাও কমেনি। সকাল থেকেই শহরের মসজিদগুলোতে বিশেষ দোয়ার আয়োজন ছিল। মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ নতুন পোশাক পরে একে অপরকে আলিঙ্গন করে জানিয়েছেন ঈদের শুভেচ্ছা। ঘরে ঘরে তৈরি হয়েছে বিরিয়ানি, রেজাল্লা আর মিষ্টি সেমাইয়ের সম্ভার। আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর উপহার আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে পালিত হলো সম্প্রীতির বকরি ইদ। রেড রোডের মঞ্চ বা রাস্তায় নমাজের চেনা রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে, এই বছর কলকাতা যেন ধর্ম ও সংস্কৃতির এক নতুন সমন্বয়ের সাক্ষী থাকল।





