রক্তের রং লাল—এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু আপনি কি জানেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানে এমন এক রক্তের সন্ধান পাওয়া গেছে যাকে বলা হয় ‘গোল্ডেন ব্লাড’ বা সোনালি রক্ত? নাম শুনে মনে হতে পারে এর রং বুঝি সোনালি, কিন্তু আদতে এটি লাল রঙের হলেও এর দুষ্প্রাপ্যতা একে সোনার চেয়েও দামী করে তুলেছে। গত ৬০ বছরে সারা বিশ্বে মাত্র ৪৩ থেকে ৫০ জন মানুষের শরীরে এই রক্তের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
কেন এই রক্ত এত বিরল? চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘Rh-null’ (আরএইচ-নাল)। সাধারণত মানুষের লোহিত রক্তকণিকায় ৬১ ধরনের অ্যান্টিজেন বা প্রোটিন থাকে। কিন্তু যাদের শরীরে এই ৬১টি অ্যান্টিজেনের একটিও থাকে না, তাদের রক্তকেই ‘গোল্ডেন ব্লাড’ বলা হয়। ১৯৬১ সালে প্রথম এক গর্ভবতী মহিলার শরীরে এই বিশেষ ধরনের রক্তের খোঁজ মিলেছিল।
গোল্ডেন ব্লাডের বিশেষত্ব ও ঝুঁকি:
সবার জন্যই জীবনদায়ী: এই রক্তের অধিকারীরা হলেন প্রকৃত ‘ইউনিভার্সাল ডোনার’। যেকোনো বিরল গ্রুপের মানুষকে এই রক্ত দেওয়া সম্ভব, কারণ এতে কোনো অ্যান্টিজেন নেই যা অন্য শরীরে গিয়ে বিক্রিয়া করবে।
নিজেদের জন্য চরম বিপদ: গোল্ডেন ব্লাড যাদের শরীরে আছে, তাদের যদি কখনো রক্তের প্রয়োজন হয়, তবে তারা সাধারণ কোনো গ্রুপের (A, B, AB, O) রক্ত নিতে পারেন না। একমাত্র অন্য কোনো গোল্ডেন ব্লাড দাতার রক্তই তাঁদের প্রাণ বাঁচাতে পারে, যা খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
বংশগত মিউটেশন: এটি মূলত একটি বিরল জেনেটিক মিউটেশনের কারণে হয়। প্রতি ৬০ লক্ষ মানুষের মধ্যে মাত্র একজনের শরীরে এই রক্ত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের অমূল্য সম্পদ: চিকিৎসকদের মতে, এই এক ফোঁটা রক্ত যেন এক গ্রাম সোনার চেয়েও মূল্যবান। এটি গবেষণার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এই ৪৩-৪৯ জন মানুষের রক্তের ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম রক্ত তৈরি করতে।
প্রকৃতির এই রহস্যময় সৃষ্টি একদিকে যেমন চিকিৎসা বিজ্ঞানের আশীর্বাদ, অন্যদিকে এই রক্তের অধিকারীদের জন্য এক নিরন্তর চ্যালেঞ্জ। জীবন বাঁচানোর এই ‘গোল্ডেন চাবিকাঠি’ এখন বিজ্ঞানীদের কাছে গবেষণার অন্যতম প্রধান বিষয়।





