মহাত্মা গান্ধীর (Mahatma Gandhi) একটি মন্তব্যকে ঘিরে ‘বন্দে মাতরম’ (Vande Mataram) গানটি স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় থেকেই বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল। অসহযোগ-খিলাফত আন্দোলনের (Non-Cooperation-Khilafat Movement) ঠিক আগে, ১৯২০ সালে মাদ্রাজ (Madras) সফরে গিয়ে গান্ধীজি ‘বন্দে মাতরম’-কে সরাসরি ‘আল্লাহু আকবর’-এর (Allahu Akbar) সমতুল্য বলে ঘোষণা করেন। তাঁর এই অবস্থানে মুসলিম সমাজের একাংশ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল।
🤝 হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের সেই বিতর্কিত স্লোগান
ইতিহাসবিদদের দাবি, ১৯২০ সালে মাদ্রাজ সফরের সময় তাঁকে স্বাগত জানানোর নানা স্লোগানে গান্ধীজি স্বচ্ছন্দ বোধ করেননি। তার মধ্যে অন্যতম ছিল ‘বন্দে মাতরম’। এই প্রসঙ্গে মহাত্মা গান্ধী নাকি বলেছিলেন, হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের কথা বলা সত্ত্বেও দুই সম্প্রদায় নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ‘বন্দে মাতরম’ এবং ‘আল্লাহু আকবর’ ব্যবহার করে। অতএব, ‘বন্দে মাতরম’ হলো ‘আল্লাহু আকবর’-এর সমতুল্য।
বিখ্যাত ইতিহাসবিদ সব্যসাচী ভট্টাচার্য তাঁর ‘বন্দে মাতরম, দ্য বায়োগ্রাফি অফ আ সং’ বইতে লিখেছেন, সহিংসতার উসকানি দেওয়ার জন্য ‘বন্দে মাতরম’ স্লোগান হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় তা জাতীয় গর্বের প্রতীক থেকে বিতর্কের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছিল। তিনি উল্লেখ করেন, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সময় মুসলমানদের উত্তেজিত করতে এই স্লোগান ব্যবহার করা হতো, ঠিক যেমন মুসলমানরা ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দিত। এই প্রবণতা আজও চলছে।
📜 কংগ্রেসের সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: দুটি স্তবকে সীমাবদ্ধ রাখার রহস্য!
গান্ধীজি, জওহরলাল নেহেরু (Jawaharlal Nehru) এবং রাজেন্দ্র প্রসাদের (Rajendra Prasad) নেতৃত্বে কংগ্রেস ‘বন্দে মাতরম’-কে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত করার সিদ্ধান্ত নিলেও, মুসলিম নেতাদের আপত্তির মুখে গানটিকে মাত্র দুটি স্তবকে সীমাবদ্ধ রাখার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই সিদ্ধান্ত কোনো গোপন বিষয় ছিল না; বরং এটি ছিল মুসলিম নেতাদের উদ্বেগের একটি স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া। এই সংকটের সমাধান করতে কংগ্রেসের অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore) নিজেই সংক্ষিপ্ত সংস্করণটিকে সমর্থন করেন এবং প্রথম দুটি স্তবক ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
-
১৮৭৫ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (Bankim Chandra Chatterjee) রচিত মূল ‘বন্দে মাতরম’-এ মাত্র দুটি স্তবক ছিল।
-
পরে ১৮৮২ সালে ‘আনন্দ মঠ’ উপন্যাসে তিনি এটিকে ছয়টি স্তবকে প্রসারিত করেন।
১৯৩৮ সালের অক্টোবরে কলকাতায় কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে গান্ধীজি, নেহরু, প্যাটেল, এবং সুভাষচন্দ্র বসুর (Subhas Chandra Bose) উপস্থিতিতে ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম দুটি স্তবক ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত হয়।
😡 জিন্নাহ-র সেই তীব্র আপত্তি: ওয়াক আউটের ঘটনা
বঙ্কিমচন্দ্রের গানটি নিয়ে মুসলমান সম্প্রদায়ের একাংশের আপত্তি স্বাধীনতারও বহু আগে থেকে শুরু হয়েছিল। সন্ন্যাসী বিদ্রোহে মুসলিম জমিদারদের বিরুদ্ধে এই গান ব্যবহৃত হওয়ায় ইসলাম ধর্মের অনেকে এটিকে সাম্প্রদায়িক বলে মনে করতে শুরু করেন।
-
১৯২৩ সালে কংগ্রেসের সভাপতিত্ব গ্রহণের পর মহম্মদ আলি জওহর (Mohammad Ali Jauhar) ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার পরপরই সভা থেকে ওয়াক আউট করেন।
-
এমনকি মুহাম্মদ আলী জিন্নাহও (Muhammad Ali Jinnah) গানটির তীব্র বিরোধিতা করেন। ১৯৩৮ সালে তিনি নেহরুর সঙ্গে এই নিয়ে আলোচনারও চেষ্টা করেন এবং অভিযোগ করেন, “মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর জন্য এই স্তোত্রকে ব্যবহার করা হচ্ছে।”
স্বাধীনতার বহু বছর পরেও, এই গানটি ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত হওয়ার পেছনের বিতর্ক ও সেই সময়ের রাজনৈতিক টানাপোড়েন আজও প্রাসঙ্গিক।