আমাদের ছায়াপথ, অর্থাৎ মিল্কি ওয়ের (Milky Way) কেন্দ্রে বহুদিন ধরে এক অদ্ভুত ও রহস্যময় আলো (Diffuse Glow) বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে। এই আলো উচ্চ-শক্তির বিকিরণ গামা রশ্মি (Gamma Rays) থেকে নির্গত হয়, যা সাধারণত দ্রুত ঘূর্ণনশীল বা বিস্ফোরিত নক্ষত্রের সঙ্গে যুক্ত। ২০০৮ সালে ফের্মি গামা-রে স্পেস টেলিস্কোপ (Fermi Gamma-ray Space Telescope) এই দীপ্তি প্রথম পর্যবেক্ষণ করার পর থেকে এর উৎস নিয়ে জল্পনা চলছে।
ডার্ক ম্যাটার না পালসার?
মহাকাশের এই রহস্যময় আলোর উৎস নিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে দুটি প্রধান তত্ত্ব প্রচলিত রয়েছে:
১. পালসার (Pulsars): কিছু বিজ্ঞানীর মতে, বিস্ফোরিত নক্ষত্রের দ্রুত ঘূর্ণনশীল অবশেষ, অর্থাৎ পালসারগুলি এই গ্যালাকটিক আলোর জন্য দায়ী হতে পারে। ২. ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter): অন্য একটি তত্ত্ব হল, এই দীপ্তির উৎস হলো ডার্ক ম্যাটারের কণাগুলির মধ্যে সংঘর্ষ।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গামা রশ্মির এই আলোর আকৃতি ছায়াপথের কেন্দ্রে থাকা ঘন তারকাপুঞ্জ গ্যালাকটিক বাল্জ (Galactic Bulge)-এর মতো। যেহেতু এই বাল্জ অঞ্চলে পালসারসহ পুরোনো নক্ষত্রের আধিক্য, তাই পালসার তত্ত্বটি বেশ জোরালো ছিল।
নতুন সিমুলেশন: ডার্ক ম্যাটারের দিকে পাল্লা ভারী
সম্প্রতি সুপারকম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে একটি যুগান্তকারী তথ্য উঠে এসেছে। এই সিমুলেশনে দেখা গেছে, ডার্ক ম্যাটারের কণাগুলির সংঘর্ষও বাল্জের মতো আকৃতির আলো তৈরি করতে পারে! এই আবিষ্কার ডার্ক ম্যাটার তত্ত্বকে নতুন করে বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েছে।
জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিদ্যার অধ্যাপক এবং এই গবেষণার সহ-লেখক জোসেফ সিল্ক (Joseph Silk) বলেন, “এই মুহূর্তে ডার্ক ম্যাটারই যে উৎস, তার সম্ভাবনা ৫০%।” গবেষণাপত্রটি ‘Physical Review Letters’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
ডার্ক ম্যাটারের অবস্থান: ডিম্বাকৃতি মডেল
সিল্কের গবেষণায় ছায়াপথের সৃষ্টির প্রক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে ডার্ক ম্যাটারের সম্ভাব্য অবস্থান ম্যাপ করার জন্য সুপারকম্পিউটার ব্যবহার করা হয়।
পুরোনো মডেল: আগে ধারণা করা হতো, আমাদের ছায়াপথে ডার্ক ম্যাটার একটি গোলকাকার (Spherical) আকৃতিতে বিন্যস্ত।
নতুন মডেল: সিল্কের সিমুলেশনে দেখা যায়, এই অদৃশ্য পদার্থের কেন্দ্রীয় অংশটি আসলে চ্যাপ্টা, অনেকটা ডিম্বাকৃতির (Egg-shaped)।
ডার্ক ম্যাটারের এই নতুন আকৃতি ফের্মি টেলিস্কোপের গামা রশ্মির তথ্যের সাথে অবিশ্বাস্যভাবে মিলে যায়, যা ছায়াপথের কেন্দ্রে এই রহস্যময় আলোর সঙ্গে ডার্ক ম্যাটারের একটি শক্তিশালী যোগসূত্রের ইঙ্গিত দেয়।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
এই রহস্যের চূড়ান্ত সমাধান হতে পারে ভবিষ্যতের একটি যন্ত্রের মাধ্যমে। সেরেঙ্কভ টেলিস্কোপ অ্যারে অবজারভেটরি (Cherenkov Telescope Array Observatory – CTAO) নামে চিলি ও স্পেনে যে নতুন যন্ত্রটি তৈরি হচ্ছে, তা ২০২৭ সাল থেকে তথ্য পাঠানো শুরু করবে।
CTAO ফের্মি টেলিস্কোপের চেয়ে অনেক বেশি রেজোলিউশনে গামা রশ্মি শনাক্ত করতে সক্ষম। এর মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে যে, গ্যালাক্সির কেন্দ্রে নির্গত গামা রশ্মি সত্যিই ডার্ক ম্যাটার কণার সংঘর্ষের ফল কি না। যদি এটি নিশ্চিত হয়, তবে এটি পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত রহস্যগুলির একটির সমাধান করবে এবং প্রমাণ করবে যে ডার্ক ম্যাটারের কিছু অংশ উইম্পস (WIMPs – Weakly Interacting Massive Particles) দিয়ে তৈরি।