মরণফাঁদ হোটেল! একটি দরজা, সিল করা জানালা, ৪টি সিলিন্ডার—দিল্লি অগ্নিকাণ্ডে উঠে এল গা শিউরে ওঠা তথ্য

দক্ষিণ দিল্লির মালব্য নগরের হৌজ রানি এলাকায় ‘ফ্লরিশ স্টে’ হোটেলে ঘটা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা গা শিউরে ওঠা তথ্য অবশেষে প্রকাশ্যে এল। বুধবার সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ ঘটা এই ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারিয়েছেন ২১ জন। মৃতদের মধ্যে ১২ জন বিদেশি নাগরিক এবং ৯ জন ভারতীয়। ২০২২ সালের পর রাজধানীর বুকে এটাই সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অগ্নিকাণ্ড। এই ঘটনায় আরও অন্তত ১০-১২ জন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে লড়ছেন। পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে অবৈজ্ঞানিক স্থাপত্য এবং চরম প্রশাসনিক গাফিলতির এক ভয়ংকর চিত্র।

প্রাথমিক তদন্তে তদন্তকারীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত। কিন্তু তা কেন বিধ্বংসী আকার ধারণ করল, তার কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পুলিশ চমকে গেছে। পাঁচ তলাবিশিষ্ট হোটেলটিতে যাতায়াতের জন্য ছিল মাত্র একটি সরু পথ (Single Entry-Exit Point)। অগ্নিকাণ্ডের সময় জরুরি প্রয়োজনে বেরিয়ে আসার জন্য কোনো ‘ফায়ার এক্সিট’ বা আপৎকালীন পথ ছিল না। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, হোটেলের ঘরের জানলাগুলো স্থায়ীভাবে সিল করা ছিল। আগুন লাগার পর বিষাক্ত ধোঁয়া যেমন বাইরে বেরোতে পারেনি, তেমনই ঘরের ভেতর আটকে পড়া মানুষরাও জানলা ভেঙে প্রাণ বাঁচানোর সুযোগ পাননি। সেন্সর-চালিত মূল সদর দরজাটি বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতেই জ্যাম হয়ে গিয়েছিল, ফলে আবাসিকদের জন্য পালানোর সব পথ বন্ধ হয়ে যায়।

হোটেলটির অন্দরসজ্জা ও কাঠামোগত ত্রুটি ছিল প্রকট। একতলায় রেস্তোরাঁ এবং বেসমেন্ট ও ওপরের তলাগুলো হোটেল হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, নিরাপত্তার ন্যূনতম নিয়ম মানা হয়নি। পুলিশি অনুসন্ধান অনুযায়ী, হোটেলটির বেসমেন্ট এবং ছাদে দুটি রান্নাঘর ছিল, যেখানে অন্তত চারটি বড় বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডার মজুত রাখা ছিল। শর্ট সার্কিটের স্ফুলিঙ্গ এই সিলিন্ডারগুলোতে আঘাত করতেই তা নিমেষের মধ্যে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটায় এবং আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক গাফিলতি হলো, এই হোটেলটির কোনো বৈধ অগ্নিনির্বাপণ ছাড়পত্র বা ‘ফায়ার এনওসি’ (Fire NOC) ছিল না। আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা তো দূরের কথা, প্রাথমিক পর্যায়ের অগ্নি নির্বাপক সামগ্রীও সেখানে কার্যকর ছিল না। ব্যবসায়িক মুনাফার লোভে মানুষের জীবনের সঙ্গে এই যে চরম ছিনিমিনি খেলা হয়েছে, তা এখন কাঠগড়ায়। দিল্লি পুলিশ হোটেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই ভয়াবহ ঘটনার পেছনে আর কোন কোন প্রশাসনিক বা সরকারি আধিকারিকের গাফিলতি রয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত চলছে। ১৪০ বছরের পুরোনো দিল্লিতে এমন মরণফাঁদ আর কোথায় কোথায় ছড়িয়ে রয়েছে, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে শহরবাসীর মনে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy