পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ এবং ঘটনাবহুল অধ্যায়ের যবনিকা কি তবে কালীঘাটের হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটেই হতে চলেছে? ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট হতেই এখন এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে রাজ্যজুড়ে। সরকারিভাবে তিনি এখনও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, এখনও ইস্তফাপত্র জমা দেননি। কিন্তু নথিপত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামের পাশে ‘প্রাক্তন’ তকমাটা এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। দুই শতাধিক আসনে জয়লাভ করে বিজেপি যখন সরকার গড়ার প্রস্তুতি তুঙ্গে রেখেছে, তখনই এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে তৃণমূল নেত্রীর চিরচেনা গড়কে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের কেন্দ্র ভবানীপুর থেকে। যে ঘরের মাঠ থেকে তিনি বরাবর অপরাজেয় থেকেছেন, সেখানেই এবার তাঁকে প্রায় ১৬ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারের মুখ দেখতে হয়েছে। এই পরাজয় কেবল একটি আসনের হার নয়, বরং তৃণমূলের অন্দরে এক যুগের অবসানের ইঙ্গিত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আর এই পটপরিবর্তনের প্রথম দৃশ্যমান প্রতিফলন দেখা গেল তাঁর বাড়ির নিরাপত্তায়।
৩০বি, হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট—এই ঠিকানাটি গত দেড় দশকে বাংলার ক্ষমতার অলিন্দ হিসেবে পরিচিত ছিল। রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে মুখ্যমন্ত্রী হওয়া পর্যন্ত মমতা এই পৈতৃক বাড়িতেই থেকেছেন। অতি সাধারণ টালির চালের সেই ঘরবাড়ি খুব একটা না বদলালেও, বদলে গিয়েছিল সংলগ্ন রাস্তার মানচিত্র। ২০১৬ সালের পর থেকে তাঁর নিরাপত্তার খাতিরে হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটকে কার্যত একটি দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করা হয়েছিল। সাধারণ মানুষের অবাধ যাতায়াত বন্ধ হয়েছিল, মেইন রোড থেকে ঢুকতে গেলেও পার হতে হতো একের পর এক গার্ডরেল ও পুলিশি তল্লাশি।
তবে সোমবার সকাল থেকেই দেখা গেল ভিন্ন ছবি। নির্বাচনের ফলাফল বিজেপি-র অনুকূলে যেতেই এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয় নিশ্চিত হতেই তাঁর বাড়ির সামনের সেই বিশেষ নিরাপত্তা বলয় আলগা হতে শুরু করেছে। যে রাস্তা দিয়ে ভিভিআইপি কনভয় ছাড়া কারও প্রবেশাধিকার ছিল না, সেখান থেকে সরছে পুলিশি পাহারা। অনেক জায়গাতেই গার্ডরেল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ ১০ বছর পর এই রাস্তা কি আবার সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে? এই জল্পনাই এখন তুঙ্গে। ক্ষমতার পালাবদলের এই দৃশ্যমান বদল দেখে স্থানীয় বাসিন্দারাও স্তম্ভিত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তিনি বিরোধী নেত্রীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন না কি পর্দার আড়ালে চলে যাবেন, তা নিয়ে যখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে, তখন হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের এই ছবিই বলে দিচ্ছে—বাংলায় এক নতুন রাজনৈতিক সূর্যোদয় ঘটেছে।





