বিশ্বজুড়ে তেল সংকট, ট্রাম্পের হামলার বদলায় হরমুজ বন্ধের ঘোষণা তেহরানের!

মধ্যপ্রাচ্যে গত কয়েক দিনে ঘটে যাওয়া নাটকীয় ঘটনাক্রম বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়েছে। ইরানের সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীর ধারাবাহিক বিমান হামলার প্রতিক্রিয়ায় তেহরান তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী তুরুপের তাসটি ব্যবহার করেছে। ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) ঘোষণা করেছে, তারা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর ‘হরমুজ প্রণালী’ পুরোপুরি বন্ধ করে দিচ্ছে। এই পদক্ষেপের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি মারাত্মক এনার্জি শকের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব সাধারণ মানুষের বাজেট থেকে শুরু করে দেশের জিডিপি পর্যন্ত স্পর্শ করতে শুরু করেছে।

উত্তেজনার সূত্রপাত হয় যখন মার্কিন বিমানবাহিনী ইরানের কিশ আইল্যান্ড ও বন্দর আব্বাসে টানা দুদিন ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওভাল অফিস থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “আমরা কোনোভাবেই ইরানকে পরমাণু চুক্তির আড়ালে উত্তেজনা ছড়াতে দেব না।” মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ক্র্যাশ এবং পরমাণু আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় হোয়াইট হাউস এই কঠোর সামরিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এর জবাবে ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, সামরিক কমান্ড ঘোষণা করেছে যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলেই তাকে সরাসরি ‘শত্রুপক্ষের লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। যদিও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) দাবি করেছে যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এখনও স্বাভাবিক আছে, তবুও দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী দাবিতে বিশ্ব বাজারে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

হরমুজ প্রণালী কেবল একটি জলপথ নয়, এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির লাইফলাইন। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত ও কাতারসহ প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল প্রতিদিন এই পথ দিয়ে সারা বিশ্বে পৌঁছায়। এই পথ বন্ধ হওয়া মানেই বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া। ইতিমধ্যে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক বাজারে; খবর চাউর হতেই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৯৫.৪০ ডলারে পৌঁছেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, হরমুজ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বিশ্ব সাতটি ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হবে:
প্রথমত, বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের ২০ শতাংশ বন্ধ হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, তেলের আকাশছোঁয়া দাম পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিবে। তৃতীয়ত, প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) সংকটে এশিয়া ও ইউরোপ অন্ধকারে ডুবতে পারে। চতুর্থত, বিশ্বজুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাবে। পঞ্চম ও ষষ্ঠত, সার সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় খাদ্য সংকট এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি তৈরি হবে। সবশেষে, সংস্থাগুলোর ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে ব্যাপক ছাঁটাই ও দারিদ্র্যের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বর্তমানে বিশ্ব যেন এক বারুদের স্তূপের ওপর বসে আছে। সুপারমার্কেটের তাক, বিদ্যুতের বিল কিংবা শেয়ার বাজারের স্থায়িত্ব—সবই এখন নির্ভর করছে হরমুজের এই অচলাবস্থা কত দ্রুত নিরসন হয় তার ওপর।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy