প্রশ্নফাঁস, অনিয়ম এবং প্রযুক্তিগত ত্রুটির জেরে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA) যখন দেশজুড়ে বিতর্কের কেন্দ্রে, ঠিক তখনই পরীক্ষার মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা ফেরাতে সংসদের স্থায়ী কমিটি একটি বিস্ফোরক সুপারিশ করেছে। কমিটির স্পষ্ট নির্দেশ—NTA-কে ফের খাতা-কলমের পরীক্ষাকে (Pen and Paper Exam) অগ্রাধিকার দিতে হবে।
কংগ্রেসের রাজ্যসভা সাংসদ দিগ্বিজয় সিংয়ের নেতৃত্বাধীন শিক্ষা বিষয়ক স্থায়ী কমিটি সোমবার সংসদে এক বিশদ প্রতিবেদন জমা দিয়ে এই কঠোর অবস্থান তুলে ধরেছে।
CBT-তে হ্যাকিংয়ের ভয়: UPSC মডেলই ভরসা
সংসদীয় কমিটির মতে, কম্পিউটার-ভিত্তিক পরীক্ষা (CBT) চালুর ফলে হ্যাকিংয়ের মতো জটিল ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যার চিহ্ন খুঁজে পাওয়া কঠিন। অন্যদিকে, ইউপিএসসি (UPSC) এবং সিবিএসই-র (CBSE) বোর্ড পরীক্ষার মতো খাতা-কলমের পরীক্ষাগুলি বছরের পর বছর ধরে সফলভাবে ও নির্ভুলভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে:
CBT চালু থাকলেও তা কেবলমাত্র সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন পরীক্ষাকেন্দ্রে আয়োজন করা উচিত, যাতে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি হ্রাস পায়।
২০২৪ সালের NEET পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের পর কমিটির এই সুপারিশগুলির গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। কমিটি জানিয়েছে, গত বছর NTA-এর নেওয়া ১৪টি পরীক্ষার মধ্যে ৫টিতেই বড় সমস্যা দেখা গিয়েছিল, যার মধ্যে তিনটি স্থগিত রাখতে হয়েছিল।
৪৪৮ কোটি উদ্বৃত্ত টাকা ও কোচিংয়ের রমরমা
কমিটি NTA-র আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। ছয় বছরে NTA ৩,৫১২.৯৮ কোটি টাকা আয় করলেও, ব্যয় হয়েছে ৩,০৬৪.৭৭ কোটি। অর্থাৎ, সংস্থার হাতে উদ্বৃত্ত রয়েছে প্রায় ৪৪৮ কোটি টাকা। কমিটি সুপারিশ করেছে, এই উদ্বৃত্ত তহবিল পরীক্ষাব্যবস্থা ও নজরদারি শক্তিশালী করতে ব্যবহার করা উচিত।
অন্যদিকে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার সিলেবাস স্কুল কারিকুলাম থেকে সরে যাওয়ায় কোচিং সেন্টারগুলো ফুলেফেঁপে উঠছে। কমিটি শিক্ষামন্ত্রক ও NTA-কে নির্দেশ দিয়েছে—পরীক্ষার প্রশ্ন যেন স্কুল পাঠ্যসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। কোচিং সেন্টারের লাগামছাড়া বৃদ্ধিতে নিয়ন্ত্রণ আনতে একটি উচ্চস্তরীয় কমিটি গঠনেরও সুপারিশ করা হয়েছে।
CUET ফল প্রকাশে দেরি ও NAAC-এ ঘুষকাণ্ড
প্রতিবেদনে আরও দুটি বড় উদ্বেগ উঠে এসেছে:
CUET-এর দীর্ঘসূত্রিতা: CUET পরীক্ষার ফল ঘোষণায় দেরির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি এবং সেশন শুরু দুটোই বিলম্বিত হচ্ছে, যা ছাত্রছাত্রীদের ওপর মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে। তাই ফলপ্রকাশের সময়সীমা নির্দিষ্ট ও দ্রুত করার ওপর জোর দিতে বলা হয়েছে।
NAAC-এ ঘুষকাণ্ড: উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মূল্যায়ন সংস্থা NAAC-এর বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার গুরুতর অভিযোগে সিবিআই তদন্ত শুরু হওয়ার পর কমিটি NAAC-কে পূর্ণাঙ্গ অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে। কমিটির মতে, এই ঘটনা উচ্চশিক্ষা মূল্যায়ন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
স্থায়ী কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, ঘুষকাণ্ডের পর NAAC প্রায় ২০০টি প্রতিষ্ঠানের গ্রেড পুনর্বিবেচনা করেছে এবং ৯০০ জন পিয়ার অ্যাসেসর বাদ দিয়েছে। কমিটি বলেছে—এই পদক্ষেপগুলোর যথাযথ ব্যাখ্যা ও তদন্তফল প্রকাশ্যে আনতে হবে, যাতে শিক্ষাজগতের আস্থা ফিরে আসে। খুব শিগগিরই NAAC নতুন স্বীকৃতি-ব্যবস্থা ও পোর্টাল চালু করবে বলে আশা করা হচ্ছে।