শহর জুড়ে এখন উৎসবের মেজাজ। দীপাবলির প্রাক্কালে রাতের শহর ক্রমশ আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠছে। আধুনিকতার চাকচিক্য, এলইডি টুনি আর আতসবাজির দাপটের মধ্যেও অনেক বাড়ির ছাদে বা উঠোনের এক কোণে লম্বা বাঁশের ডগায় আজও টিমটিম করে জ্বলে ওঠে আকাশপ্রদীপ (Akash Pradip)। এই স্নিগ্ধ আলো যেন এক চিরন্তন বার্তা বহন করে চলেছে। এই আকাশপ্রদীপ জ্বালানোর তাৎপর্য কী, তা জানেন না আধুনিক প্রজন্মের অনেকেই।
এর উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় লোকবিশ্বাস, পুরাণ আর ঐতিহ্যের দিকে। নিচে আকাশপ্রদীপ জ্বালানোর প্রধান চারটি কারণ তুলে ধরা হলো:
১. পিতৃপুরুষদের পথ দেখানো
আকাশপ্রদীপ জ্বালানোর প্রধান ও সর্বাধিক প্রচলিত কারণটি হলো পিতৃপুরুষদের স্বর্গলোকে ফেরার পথ আলোকিত করা।
বিশ্বাস: লোকবিশ্বাস অনুসারে, মহালয়ার পূণ্যতিথিতে পূর্বপুরুষরা জল-তর্পণে তুষ্ট হয়ে মর্ত্যে নেমে আসেন এবং দীপাবলি পর্যন্ত নিজ নিজ পরিবার-পরিজনের কাছাকাছি অবস্থান করেন।
উদ্দেশ্য: দীপাবলির অমাবস্যার ঘোর অন্ধকারে তাঁদের স্বর্গলোকে ফেরার পথ যাতে গুলিয়ে না যায়, তাই সেই পথ আলোকিত করার জন্য বংশধরেরা উঁচু জায়গায় আকাশপ্রদীপ জ্বালিয়ে দেন। এটি তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা ও আত্মার শান্তিকামনার প্রতীক।
২. শ্রীরামচন্দ্রের বিজয় বার্তা
আকাশপ্রদীপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রামায়ণের পৌরাণিক কাহিনি।
ইতিহাস: চোদ্দ বছর বনবাস এবং লঙ্কাজয়ের পর দীপাবলির দিনই শ্রীরামচন্দ্র অযোধ্যায় ফিরেছিলেন।
স্মরণ: তাঁর প্রত্যাবর্তনের আনন্দে অযোধ্যাবাসী সমগ্র নগর দীপমালায় সাজিয়ে তুলেছিল। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্মরণ করেও অনেকে আকাশপ্রদীপ জ্বালান। উঁচু জায়গায় রাখা এই প্রদীপ যেন দূর থেকে বিজয়ীর ঘরে ফেরার পথকেই আলোকিত করে।
৩. দেবী কালী ও লক্ষ্মীকে স্বাগত জানানো
দীপাবলি হলো ধন ও সমৃদ্ধির উৎসব, এবং এই দিনেই হয় শ্যামা মায়ের পূজা।
আমন্ত্রণ: বিশ্বাস করা হয়, এই অমাবস্যার রাতে দেবী তাঁর ভক্তদের গৃহে পদার্পণ করেন। নিজের বাড়িকে দেবীর কাছে আরও আকর্ষণীয় এবং উজ্জ্বল করে তুলতে, এবং অন্ধকার দূর করে তাঁর আগমনকে স্বাগত জানাতে আকাশপ্রদীপ জ্বালানোর প্রথা প্রচলিত আছে। এটি যেন দেবীকে নিজের গৃহে আসার জন্য এক আলোর আমন্ত্রণ।
৪. আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
এই সমস্ত কারণের ঊর্ধ্বে রয়েছে এক গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য।
অন্ধকার দূর করা: দীপাবলির অমাবস্যা বছরের সবচেয়ে অন্ধকার রাতগুলোর মধ্যে অন্যতম। আকাশপ্রদীপ এই বাহ্যিক অন্ধকারের পাশাপাশি আমাদের অন্তরের অজ্ঞানতা, বিদ্বেষ এবং সকল প্রকার নেতিবাচকতা দূর করার প্রতীক।
শুভ বার্তা: এটি মঙ্গলের জয় এবং অশুভ শক্তির বিনাশের বার্তা দেয়।
আজকের দিনে হয়তো আকাশপ্রদীপের জৌলুস কমেছে, কিন্তু তার গুরুত্ব কমেনি। এটি শুধু একটি প্রথা নয়, এটি ঐতিহ্য, বিশ্বাস এবং শুভকামনার এক অনির্বাণ শিখা।