কলকাতা জুড়ে এখন একটাই আতঙ্ক— ‘ডোমিসাইল সার্টিফিকেট’ বা নিবাসী শংসাপত্র। এসআইআর (SIR) আবহে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে যখন সাধারণ মানুষ মরিয়া, ঠিক তখনই এই শংসাপত্র নিয়ে কড়া অবস্থান নিল নির্বাচন কমিশন। প্রথমে ডোমিসাইল সার্টিফিকেটকে মান্যতা দিলেও, হঠাৎ ‘ইউটার্ন’ নিয়ে কমিশন জানিয়ে দিয়েছে, ভোটার তালিকায় নাম নথিভুক্তকরণ বা শুনানির ক্ষেত্রে এই নথি গ্রাহ্য হবে না। আর এই নির্দেশ ঘিরেই রাজ্য রাজনীতি ও জনমানসে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
ডোমিসাইল বনাম কমিশনের সংঘাত কেন? রাজ্য সরকারের ১৯৯৯ সালের নির্দেশিকা অনুযায়ী, মূলত প্রতিরক্ষা বা আধা সামরিক বাহিনীতে চাকরির জন্য এই শংসাপত্র দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে এটি তৈরির হিড়িক পড়েছে। কমিশনের পর্যবেক্ষণ হলো, পশ্চিমবঙ্গে যে পদ্ধতিতে ডোমিসাইল সার্টিফিকেট ইস্যু করা হচ্ছে, তা নির্দিষ্ট সরকারি নির্দেশিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কমিশনের দাবি, কেবল জেলাশাসকদের এটি দেওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে এসডিও-রা এটি ইস্যু করছেন, যাঁরা আবার এসআইআর পর্বে নির্বাচনী আধিকারিক (ERO) হিসেবে কাজ করছেন। এই ‘স্বার্থের সংঘাত’ এবং ইস্যু করার প্রক্রিয়ায় অসামঞ্জস্যের কারণেই কমিশন এই নথি গ্রহণে নারাজ।
মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ও পুলিশের তৎপরতা: পরিস্থিতি বেগতিক দেখে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চিঠি লিখেছেন প্রধান নির্বাচনী কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে। তিনি অভিযোগ করেছেন, পরিযায়ী শ্রমিকরা এই সিদ্ধান্তে সমস্যায় পড়ছেন। অন্যদিকে, কমিশনের আপত্তির পরেও কলকাতা পুরসভা ও বরো অফিসগুলোতে আবেদনের ভিড় কমছে না। গত এক সপ্তাহে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার আবেদন জমা পড়েছে। লালবাজার সূত্রে খবর, জরুরি ভিত্তিতে মাত্র ৩ দিনের মধ্যে পুলিশ ভেরিফিকেশন শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর জন্য অতিরিক্ত পুলিশ কর্মী ও গাড়িও বরাদ্দ করা হয়েছে।
হরিদেবপুর, পর্ণশ্রী ও বেহালার মতো এলাকাগুলোতে আবেদনের সংখ্যা সবথেকে বেশি। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, যেখানে কমিশন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে এই সার্টিফিকেট ভোটার তালিকায় কোনো কাজে আসবে না, সেখানে কেন এই বিপুল তৎপরতা? বিরোধীদের দাবি, নিয়ম না মেনে শংসাপত্র বিলি করার চেষ্টা হচ্ছে বলেই কমিশন কঠোর হয়েছে। সব মিলিয়ে ডোমিসাইল সার্টিফিকেট এখন নিছক বসবাসের প্রমাণ নয়, বরং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক লড়াইয়ের বড় হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।