আইন রক্ষার দায়িত্ব যাঁদের কাঁধে, তাঁদের বিরুদ্ধেই যখন খুনের অভিযোগ ওঠে, তখন বিচারব্যবস্থার ভিত কেঁপে ওঠে। মহারাষ্ট্রে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা এক অন্তহীন ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি বোম্বে হাইকোর্টের এক রায় এই গভীর ক্ষতকে আবারও প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে। ২০১৪ সালে ওয়াডালা রেল পুলিশের হেফাজতে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় ৮ পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে খুনের মামলা বহাল রেখেছে উচ্চ আদালত। কিন্তু এই বিচার পাওয়ার লড়াইটা যে কতটা কঠিন, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাম্প্রতিক রিপোর্ট।
পরিসংখ্যানের ভয়াল চিত্র: শীর্ষে মহারাষ্ট্র
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর তালিকায় ধারাবাহিকভাবে শীর্ষে রয়েছে মহারাষ্ট্র। ১৯৯৪ থেকে ২০২২ সালের পরিসংখ্যান বলছে, এই রাজ্যে বছরে গড়ে ২১টি করে ‘কাস্টডিয়াল ডেথ’ রেকর্ড করা হয়েছে। গত পাঁচ বছরের চিত্রটা আরও ভয়াবহ—কেবল এই সময়েই ১০১ জন বন্দি প্রাণ হারিয়েছেন পুলিশের খাঁচায়।
তালিকায় পরবর্তী রাজ্যগুলো হলো:
গুজরাট: ৮৫টি মৃত্যু
বিহার: ৭৬টি মৃত্যু
উত্তরপ্রদেশ: ৫৬টি মৃত্যু
রাজস্থান: ৫১টি মৃত্যু
বিচারের নামে প্রহসন?
উদ্বেগের বিষয় হলো, অপরাধের তুলনায় বিচার প্রক্রিয়ার ধীর গতি। ১৯৯৯ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ৪০৪টি মৃত্যুর ঘটনার মধ্যে মাত্র ৫৩টিতে এফআইআর দায়ের হয়েছিল। আর চার্জশিট জমা পড়েছিল মাত্র ৩৮টিতে। অর্থাৎ, সিংহভাগ ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত পুলিশকর্মীরা আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। সাঙ্গলিতে যুবকের দেহ পুড়িয়ে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা হোক বা পারভনীতে দলিত ছাত্রের রহস্যমৃত্যু—রক্ষকদের ‘ভক্ষক’ হয়ে ওঠার তালিকাটা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।
ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের দাবি
২০০৩ সালে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের মৃত্যু থেকে শুরু করে ২০২৫-এর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ করার পদ্ধতি এবং জবাবদিহিতার জায়গায় বড়সড় গলদ রয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, নিছক তদন্ত নয়, বরং পুলিশি ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার এবং কঠোর শাস্তির বিধান নিশ্চিত না করলে থানার চার দেয়ালের ভেতর এই ‘নিঃশব্দ মৃত্যুমিছিল’ বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
রক্ষকই যখন ঘাতক হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ মানুষের ভরসার শেষ আশ্রয়টুকুও হারিয়ে যায়। মহারাষ্ট্রের এই রেকর্ড কেবল একটি রাজ্যের কলঙ্ক নয়, বরং গোটা দেশের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন।





