আমেরিকার নতুন আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধের উপক্রম হওয়ায় বিশ্ব তেলের বাজারে তৈরি হয়েছে তীব্র আতঙ্ক। হরমুজ প্রণালী হলো বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) পরিবহণের প্রধান ধমনী। এই পথটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়লে বা বিঘ্নিত হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভয়াবহ অস্থিরতা দেখা দেওয়া অনিবার্য। আর এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে ভারত। কারণ, ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৫০ শতাংশ এবং এলপিজি (LPG) আমদানির সিংহভাগই এই পথ দিয়ে আসে। দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট ভারতের বাজারে যে সাতটি জিনিসের দাম হু হু করে বাড়িয়ে দিতে পারে, তা নিয়ে আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ।
প্রথমত, এলপিজি সিলিন্ডারের দাম। ভারত তার রান্নার গ্যাসের চাহিদার একটি বিশাল অংশ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করে। হরমুজ প্রণালীতে বিঘ্নের অর্থ হলো সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়া, যা সরাসরি রান্নার গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দেবে। দ্বিতীয়ত, পেট্রল ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি। যদিও সরকার তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে, কিন্তু অপরিশোধিত তেলের দাম যদি ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, তবে তেল বিপণনকারী সংস্থাগুলোর পক্ষে দাম না বাড়িয়ে উপায় থাকবে না। তৃতীয়ত, দুধ ও শাকসবজি। পরিবহণ খরচ বৃদ্ধির অর্থ হলো কৃষিপণ্যের দাম বৃদ্ধি। ট্রাকের ডিজেল খরচ বাড়লে পাইকারি ও খুচরা বাজারে তার প্রভাব পড়বেই।
চতুর্থত, প্যাকেটজাত খাবার। বিস্কুট, চিপস বা ইনস্ট্যান্ট নুডলসের মতো পণ্যের প্যাকেজিং পেট্রোকেমিক্যাল থেকে তৈরি হয়। অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে কোম্পানিগুলো হয় পণ্যের দাম বাড়াবে, নয়তো প্যাকেটের ওজন কমিয়ে দেবে। পঞ্চম স্থানে রয়েছে সাবান ও ডিটারজেন্ট। এগুলোর কাঁচামাল মূলত পেট্রোকেমিক্যাল ফিডস্টক থেকে আসে। ষষ্ঠত, প্লাস্টিকের গৃহস্থালির সরঞ্জাম। বালতি থেকে শুরু করে জলের বোতল বা রান্নাঘরের সরঞ্জাম—সবই পেট্রোলিয়াম-ভিত্তিক কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। পেট্রোকেমিক্যালের দাম বাড়লে এই পণ্যগুলো সাধারণ মানুষের হাতের বাইরে চলে যেতে পারে। সবশেষে, ইলেকট্রনিক্স ও মোবাইল ফোন। বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহণ ও সরঞ্জামের দাম বাড়লে ইলেকট্রনিক্স পণ্যের আমদানি খরচ বেড়ে যাবে, যার প্রভাব পড়বে সরাসরি ভোক্তাদের ওপর।
হরমুজ প্রণালীতে যে কোনো ধরনের সামরিক অস্থিরতা বা অবরোধ ভারতসহ বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনীতিগুলোকে গভীর মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে। ভারত যেহেতু আমদানিনির্ভর, তাই এই প্রণালীতে অস্থিরতা চললে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। তেলের এই খরা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে ভারতের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যে কয়েক গুণ বেড়ে যাবে, তা বলাই বাহুল্য। এখন বিশ্ব কূটনীতি এবং পরিস্থিতির ওপরই নির্ভর করছে ভারতের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ।





