বিশ্বজুড়ে কি তবে যুদ্ধের মেঘ আরও ঘনীভূত হচ্ছে? স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI)-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট অন্তত সেই আশঙ্কাই উসকে দিচ্ছে। রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে সামরিক খাতে ব্যয়ের পরিমাণ সমস্ত রেকর্ড ভেঙে পৌঁছেছে ২.৯ ট্রিলিয়ন ডলারে। টানা ১১ বছর ধরে এই গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী, যা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে শান্তির চেয়ে এখন শক্তির প্রদর্শনেই বেশি আগ্রহী রাষ্ট্রগুলো।
শীর্ষে কোন দেশগুলো?
রিপোর্ট অনুযায়ী, সামরিক ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি খরচ করছে মাত্র তিনটি দেশ— আমেরিকা, চীন এবং রাশিয়া। এই তিন মহাশক্তিধর দেশের সম্মিলিত খরচের পরিমাণ প্রায় ১.৪৮ ট্রিলিয়ন ডলার।
আমেরিকা: ৯৫৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে তালিকায় শীর্ষে ওয়াশিংটন। তবে গত বছরের তুলনায় তাদের খরচ ৭.৫% কমেছে। মূলত ইউক্রেনকে নতুন করে বড় অঙ্কের সাহায্য না দেওয়ায় এই হ্রাস। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাজেট প্রস্তাব পাশ হলে ২০২৭ সালে এই খরচ ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে!
চীন: গত তিন দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে সামরিক খরচ বাড়িয়ে চলেছে বেজিং। ২০২৫ সালে তারা ব্যয় করেছে আনুমানিক ৩৩৬ বিলিয়ন ডলার।
রাশিয়া: ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে পুতিন প্রশাসন ১৯০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, যা রাশিয়ার মোট জিডিপির ৭.৫ শতাংশ।
অস্থির ইউরোপ ও এশিয়ার চিত্র
SIPRI-এর গবেষক লরেঞ্জো স্কারাজ্জাতো জানিয়েছেন, ২০০৯ সালের পর সামরিক ব্যয়ের এই হার সর্বোচ্চ। বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলো এখন নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আমেরিকার ওপর ভরসা না করে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছে।
জার্মানি: খরচ ২৪ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৪ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে গেছে।
স্পেন: ১৯৯৪ সালের পর এই প্রথম তাদের জিডিপির ২ শতাংশের বেশি খরচ করেছে প্রতিরক্ষায়।
অন্যদিকে, এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলে খরচ ৮.৫% বেড়েছে। চীনের আধিপত্য রুখতে জাপান (৬২.২ বিলিয়ন ডলার) এবং তাইওয়ান (১৮.২ বিলিয়ন ডলার) পাল্লা দিয়ে নিজেদের ভাণ্ডার মজবুত করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের গোলমেলে সমীকরণ
আশ্চর্যের বিষয় হলো, চরম উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যে সামগ্রিক ব্যয় বেড়েছে মাত্র ০.১ শতাংশ। মুদ্রাস্ফীতির কারণে ইরানে প্রকৃত খরচ কমলেও, টাকার অঙ্কে তা বেশি। আবার গাজায় সাময়িক যুদ্ধবিরতির ফলে ইজরায়েলের খরচ কিছুটা কমলেও তা ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ৯৭ শতাংশ বেশি।
বিশেষজ্ঞের মত: “পৃথিবী এখন আগের চেয়ে অনেক কম নিরাপদ। দেশগুলো এখন আলোচনার চেয়ে অস্ত্রশস্ত্রের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে বেশি বিশ্বাসী।”
বিশ্বের এই সামরিক উন্মাদনা কি কোনো বড় ধ্বংসের ইঙ্গিত? নাকি এটি কেবলই শক্তির ভারসাম্য রক্ষার কৌশল? উত্তর দেবে ভবিষ্যৎ। তবে ২.৯ ট্রিলিয়ন ডলারের এই ‘বারুদের স্তূপ’ যে সাধারণ মানুষের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের বাজেট কমিয়ে দিচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।





