রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের মাস পেরোতে না পেরোতেই একের পর এক দুর্নীতির পর্দাফাঁস হচ্ছে। এবার সন্ত্রাসের অভিযোগ পেরিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন সরকারের বিরুদ্ধে উঠে এল এক ঘৃণ্য এবং অমানবিক দুর্নীতির নজির। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের গড় ডায়মন্ড হারবারে জ্ঞানচর্চার এক পবিত্র কেন্দ্র—একটি লাইব্রেরিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। অভিযোগ, যে লাইব্রেরিটি একসময় এলাকার ছাত্রছাত্রী ও জ্ঞানপিপাসু মানুষের বইয়ের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল, সেই পবিত্র অন্দরেই বইয়ের পরিবর্তে উদ্ধার হয়েছে সারি সারি পেটি পেটি মদ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, লাইব্রেরিটি দীর্ঘদিন ধরেই জনসাধারণের জন্য কার্যত বন্ধ ছিল। এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, দরজায় তালা ঝুলিয়ে রাখলেও রাতের অন্ধকারে সেখানে কিছু সন্দেহজনক ব্যক্তিকে যাতায়াত করতে দেখা যেত। বিষয়টি নিয়ে বহুবার প্রশ্ন উঠলেও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের দাপটে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি। অবশেষে বৃহস্পতিবার রাতে স্থানীয় মানুষ ও সচেতন রাজনৈতিক কর্মীদের উদ্যোগে বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসে।
তালি খোলার পর লাইব্রেরির ভেতর যে দৃশ্য দেখা যায়, তা দেখে হতবাক এলাকাবাসী। বই রাখার তাকগুলো সম্পূর্ণ ফাঁকা, তার পরিবর্তে সেখানে সাজানো রয়েছে মদের বোতলভর্তি কার্টন ও বড় বড় সব পেটি। একটি শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের এমন অপব্যবহার দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তাঁদের অভিযোগ, জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রটিকে রীতিমতো বেআইনি মদের গুদামে পরিণত করা হয়েছিল।
বৃহস্পতিবার রাতে খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় বিক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। স্থানীয় মহিলা ও বিজেপি কর্মী-সমর্থকেরা লাইব্রেরির সামনে জড়ো হয়ে প্রতিবাদে সামিল হন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ডায়মন্ড হারবার থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশি তল্লাশিতে লাইব্রেরির ভেতর থেকে বিপুল পরিমাণ মদের বোতল উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া মদের পরিমাণ দেখে পুলিশও চমকে উঠেছে। এটিকে একটি বড়সড় অবৈধ মদ পাচার ও মজুতের ঘটনা হিসেবেই দেখছে প্রশাসন। বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে সমস্ত মদের পেটি।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই তুঙ্গে উঠেছে রাজনৈতিক তরজা। বিজেপির পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, তৃণমূল কংগ্রেসের একাংশ দীর্ঘ সময় ধরে এই লাইব্রেরিটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। তাদের দাবি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রচার করার বদলে শাসকদলের মদতে ওই ভবনটিকে অসামাজিক কার্যকলাপ ও মদের কারবারের আখড়ায় পরিণত করা হয়েছিল। বিজেপি নেতৃত্বের স্পষ্ট বক্তব্য, এই ঘটনা প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও সংস্কৃতির চরম অবক্ষয়ের এক জ্বলন্ত উদাহরণ।
অন্যদিকে, এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে, কীভাবে একটি সরকারি লাইব্রেরির ভেতরে এত বিপুল পরিমাণ মদ মজুত করা হলো? প্রশাসনের নজর এড়িয়ে এতদিন কীভাবে এই অসামাজিক কাজ চলল? এলাকাবাসীর দাবি, শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যতের কথা না ভেবে যারা লাইব্রেরিকে মদের আস্তানা বানিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
পুলিশ সূত্রে খবর, উদ্ধার হওয়া মদ কোথা থেকে আনা হয়েছিল, কারা এর পেছনে মদতদাতা এবং এর সঙ্গে কোনো বড় আর্থিক চক্র বা রাজনৈতিক প্রভাব জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীরা স্থানীয়দের বয়ান সংগ্রহ করছেন এবং লাইব্রেরির নথিপত্র খতিয়ে দেখছেন। এই ঘটনার পর ডায়মন্ড হারবারের ওই লাইব্রেরি চত্বর ঘিরে চাপা উত্তেজনা এখনও অব্যাহত।





