দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, লবিবাজি এবং ব্যান কালচারের অন্ধকারে বন্দি টলিউড কি অবশেষে মুক্তির আলো দেখল? বুধবার টালিগঞ্জের স্টুডিয়োপাড়ায় যা ঘটল, তা নিঃসন্দেহে বাংলা বিনোদন জগতের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। বছরের পর বছর ধরে চলা ‘দাদাগিরি’, হুমকি এবং কলাকুশলীদের কোণঠাসা করে রাখার অভিযোগের বিরুদ্ধে এবার সরাসরি পথে নামলেন বিজেপি বিধায়করা। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কড়া নির্দেশ—“ভয়মুক্ত হয়ে কাজ করুন”—এই মন্ত্রকে হাতিয়ার করেই রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, হিরণ চট্টোপাধ্যায় এবং পাপিয়া অধিকারীর কাঁধে ভর করে শুরু হলো টলিপাড়ার ‘শুদ্ধিকরণ’।
বুধবার টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় পা রাখতেই পরিস্থিতি বিস্ফোরক হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিনের ভুক্তভোগী শিল্পী ও টেকনিশিয়ানরা একে একে সামনে আনেন তাঁদের না বলা যন্ত্রণা। কেউ কাজ হারানোর ভয়, কেউ বা পেশাগতভাবে নিগৃহীত হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা—সবই উঠে আসে পাপিয়া অধিকারী এবং রুদ্রনীল ঘোষের সামনে। এই সুযোগে পাপিয়া অধিকারী ঘোষণা করেন, “বিশ্বাস ব্রাদার্স বা অরূপ-স্বরূপের দাদাগিরি আর সহ্য করা হবে না।” তাঁর এই ঘোষণা কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং স্টুডিয়োপাড়ার অশুভ চক্র ভাঙার এক প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বার্তা।
সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্তটি আসে যখন পাপিয়া অধিকারী গঙ্গাজলের বোতল হাতে ফেডারেশন অফিসে প্রবেশ করেন। “শুদ্ধিকরণ করব বলেই এনেছিলাম,” বলে তিনি পুরো অফিস চত্বরে গঙ্গাজল ছিটিয়ে দেন। এরপরই ফেডারেশনের ঘরে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে তিনি জানান, দাদাগিরির যুগ শেষ। শুধু প্রতিবাদ নয়, এদিন তিনি পেশাদারিত্বের নতুন নিয়মও বেঁধে দেন। গভীর রাতে শুটিং হলে অভিনেত্রীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং অন্তত তিন দিন আগে কলটাইম জানানোর মতো দাবিগুলো তিনি প্রযোজকদের কাছে জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তাঁর মতে, অনিশ্চয়তার সংস্কৃতিতে আর শিল্পীদের দমবন্ধ অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না।
পাশাপাশি, বাংলা ধারাবাহিকের বিষয়বস্তু নিয়েও গর্জে ওঠেন এই অভিনেত্রী-বিধায়ক। বর্তমানে সিরিয়ালের চটকদার পরকীয়া, ত্রিকোণ প্রেম এবং অবাস্তব পারিবারিক জটিলতা যে সমাজের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে, তা নিয়েও তিনি সরব হন। তাঁর সাফ কথা, টিআরপির ইঁদুর দৌড়ে সুস্থ বিনোদনকে বলি দেওয়া চলবে না। শিল্পের নামে অশ্লীলতা বা বিকৃত রুচি প্রচারের বিরুদ্ধে তিনি নৈতিক অবস্থান নিয়েছেন।
এদিন স্টুডিয়ো চত্বরে ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনির মাঝে যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলল, তা কি সত্যিই দীর্ঘদিনের অস্থিরতা মুছে ফেলবে? রূপা, রুদ্রনীল, হিরণ এবং পাপিয়ার হাত ধরে বাংলা ইন্ডাস্ট্রি কি ফিরে পাবে তার হারানো সম্মান এবং স্বচ্ছ পরিবেশ? শিল্পী মহল এখন সেই আশার আলোই দেখছে। রাজনীতির বৃত্ত ছাড়িয়ে টলিউডের অন্দরমহলে এই সংস্কারের প্রয়াস কতটা সফল হয়, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা। তবে এটুকু নিশ্চিত, টালিগঞ্জের করিডরে ‘ভয়’ শব্দটির দাপট অনেকটাই কমেছে।





