সন্দেশখালির প্রাক্তন দাপুটে নেতা শেখ শাহজাহান এখন জেলবন্দি। কিন্তু কারাগারের অন্ধকারে বন্দি থেকেও কি তাঁর নেটওয়ার্কের রিমোট কন্ট্রোল এখনও তাঁরই হাতে? এই প্রশ্নই এখন রাজ্যজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। শনিবার এনআইএ (NIA), রাজ্য এসটিএফ (STF) এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর যৌথ তল্লাশিতে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন জায়গা থেকে উদ্ধার হয়েছে ১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৫৬ রাউন্ড কার্তুজ। এই বিপুল অস্ত্রভাণ্ডারের হদিশ মিলতেই নতুন করে সরগরম বঙ্গ রাজনীতি।
তদন্তকারীদের দাবি, উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ পাওয়া গেছে শাহজাহান-ঘনিষ্ঠ তৃণমূল নেতার বাড়ির পুকুর থেকে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তীর কুমড়োখালি গ্রামে তল্লাশি চালিয়ে তৃণমূল পঞ্চায়েত প্রধানের স্বামী রমজান মোল্লা-সহ মোট ৬ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, সন্দেশখালিকাণ্ডের পর যখন শেখ শাহজাহান আত্মগোপন করেছিলেন, তখন তিনি বেশ কিছুদিন এই রমজান মোল্লার বাড়িতেই লুকিয়ে ছিলেন। ধৃতদের সাথে শাহজাহানের ঘনিষ্ঠতা এবং তাদের কার্যকলাপ এখন পুলিশের নজরে।
ঘটনার সূত্রপাত ৫ জানুয়ারি, ২০২৪। রেশন কেলেঙ্কারির তদন্তে ইডি আধিকারিকরা যখন শেখ শাহজাহানের বাড়িতে পৌঁছান, তখন তাঁর শাগরেদদের হামলার শিকার হন কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিরা। এরপরই সন্দেশখালি থেকে শাহজাহান ও তাঁর অনুগামীদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বিস্ফোরণের মতো বেরিয়ে আসে। হামলার ৫৫ দিন পর রাজ্য পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। বর্তমানে সিবিআই ও ইডি—উভয় কেন্দ্রীয় সংস্থার মামলাতেই তিনি জেল হেফাজতে রয়েছেন। কিন্তু এতগুলো মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরেও তাঁর সাম্রাজ্যের দাপট বা প্রভাব যে বিন্দুমাত্র কমেনি, তা সাম্প্রতিক এই অস্ত্র উদ্ধার প্রমাণ করে দিল।
তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন নেতা তথা এই মুহূর্তে জেলবন্দি থাকা সত্ত্বেও তাঁর ঘনিষ্ঠদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হয়নি বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। বিশেষ করে সাক্ষী ভোলানাথ ঘোষের ওপর গাড়ি হামলার ঘটনাটি যেন সেই দীর্ঘস্থায়ী ত্রাসেরই পুনরাবৃত্তি। সেই ট্রাক দুর্ঘটনায় সাক্ষীর ছেলের মৃত্যু ও ড্রাইভারের প্রাণহানি গোটা রাজ্যকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। এবার জেলে বসেই কি অস্ত্রের এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করা হচ্ছিল? সেই প্রশ্নই এখন সবথেকে জোরালো।
মুখ্যমন্ত্রী এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে প্রতিক্রিয়া দিয়ে জানিয়েছেন যে, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের অভিযান ক্রমাগত চলতে থাকবে। পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তারা জানিয়েছেন, ধৃত ৬ জনের বয়ান খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারী সংস্থা মনে করছে, শাহজাহানের ছত্রছায়ায় থাকা অপরাধী চক্রটি এখনও সক্রিয় এবং তাদের মূল লক্ষ্য হলো এলাকায় ভয়ের পরিবেশ বজায় রাখা। এই অস্ত্রগুলো কোথা থেকে এল এবং কার নির্দেশে মজুদ করা হয়েছিল, সেই জট খুলতেই এখন মরিয়া তদন্তকারীরা। সন্দেশখালি থেকে বাসন্তী—আড়কাঠি ও শাগরেদদের এই জাল কতদূর বিস্তৃত, তা খুঁজে বের করাই এখন আসল চ্যালেঞ্জ।





