জলের বদলে কল দিয়ে আসছিল ‘বিষ’! ইন্দোরে লাশের পাহাড়, নেপথ্যে চরম গাফিলতি?

ছোটবেলা থেকে আমরা জানি ‘জলের অপর নাম জীবন’। কিন্তু মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে সেই জলই হয়ে উঠল যমদূত। ভগীরথপুরা এলাকায় পানীয় জলের লাইনে নর্দমার বিষাক্ত বর্জ্য মিশে ঘটে গিয়েছে এক বীভৎস ট্র্যাজেডি। এখনও পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ৯ জন নিরীহ মানুষ। হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন ২০০-র বেশি বাসিন্দা। অভিযোগ উঠছে, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং প্রশাসনের ‘পরিকল্পিত’ গাফিলতির ফল।

সতর্কবার্তা ছিল, কিন্তু কানে দেয়নি প্রশাসন

এই বিপর্যয় একদিনে ঘটেনি। ট্র্যাজেডির আড়াই মাস আগে, গত ১৫ অক্টোবর প্রথম সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা দীনেশ ভারতী বর্মা। মেয়রের হেল্পলাইনে ফোন করে তিনি জানিয়েছিলেন, বোরওয়েলে নর্দমার জল মিশছে। এরপর নভেম্বরে শিবানী নামে এক বাসিন্দা জানান, কলের জলে অ্যাসিডের মতো গন্ধ বেরোচ্ছে। এমনকি ১৮ ডিসেম্বর নর্মদার জলে পচা দুর্গন্ধ পাওয়া গেলেও কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙেনি পুরসভার। যখন এলাকা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হল, তখনই নড়েচড়ে বসল প্রশাসন।

ডিজিটাল জালিয়াতি ও লাল ফিতের ফাঁস

তদন্তে নেমে উঠে এসেছে বিস্ফোরক সব তথ্য। ওই এলাকার দায়িত্বে থাকা অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার যোগেশ জোশী অভিযোগের তোয়াক্কাই করেননি। নথিপত্র বলছে, ভগীরথপুরা থেকে আসা ২৩টি গুরুতর অভিযোগের মধ্যে ৭টি কোনো সমাধান ছাড়াই অনলাইনে ‘কমপ্লিট’ বা নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছে বলে লিখে দেওয়া হয়েছিল!

শুধু তাই নয়, পাইপলাইন সারানোর টেন্ডার ডাকা হয়েছিল ২০২৪-এর নভেম্বরে। অথচ কাজের অর্ডার দেওয়া হল ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫-এ, যখন ঘরে ঘরে কান্নার রোল উঠেছে।

পুলিশ চৌকির নিচেই লুকিয়ে ছিল ‘মৃত্যুফাঁদ’

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন অ্যাডিশনাল কমিশনার রোহিত সিসোনিয়া। জানা গিয়েছে, একটি পুলিশ চৌকির শৌচাগারের ঠিক নিচ দিয়েই গিয়েছিল মূল জলের পাইপলাইন। সেখানে কোনো সেপটিক ট্যাঙ্ক ছিল না। শৌচাগারের বর্জ্য সরাসরি একটি গর্তে জমা হতো, আর ঠিক সেখানেই ফেটে গিয়েছিল জলের পাইপ। দিনের পর দিন সেই বিষ্ঠা আর বিষাক্ত ব্যাকটেরিয়া মিশ্রিত জলই পান করেছেন এলাকাবাসী।

দায় কার? ফিরবে কি সেই প্রাণগুলো?

বর্তমানে শহরের ২৭টি হাসপাতাল এখন রোগীতে ঠাসা। অভিযুক্ত ইঞ্জিনিয়ারকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে— বিশুদ্ধ পানীয় জল পাওয়া তো নাগরিক অধিকার, তার বদলে বিষ কেন? সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় চলা প্রশাসন কেন এক বছর ধরে অভিযোগ পাওয়ার পরও হাত গুটিয়ে বসে ছিল? আজ নতুন পাইপলাইন বসছে, কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে— কিন্তু যে ৯টি পরিবার তাদের আপনজনকে হারাল, এই তৎপরতা কি তাদের ফিরিয়ে দিতে পারবে?

ইন্দোরের এই ট্র্যাজেডি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, সরকারি ফাইল আর ডিজিটাল স্ট্যাটাসের ভিড়ে সাধারণ মানুষের জীবনের মূল্য আজও তলানিতে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy