চাঁদের মাটিতে বিশাল জলের ভাণ্ডার! চন্দ্রযান-২-এর সাফল্যে তাক লাগানো তথ্য ইসরোর

মহাকাশ গবেষণায় ভারতের মুকুটে যুক্ত হলো আরও এক সাফল্যের পালক। ২০১৯ সালের চন্দ্রযান-২ মিশনের ল্যান্ডার ‘বিক্রম’ আছড়ে পড়লেও, তার অরবিটারটি গত সাত বছর ধরে মহাকাশে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। সেই অরবিটারের পাঠানো তথ্য বিশ্লেষণ করেই এক যুগান্তকারী আবিষ্কারের কথা সামনে এনেছেন আহমেদাবাদের ‘ফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি’ (PRL)-এর বিজ্ঞানীরা। চাঁদের দক্ষিণ মেরুর চির-অন্ধকারাচ্ছন্ন গর্তের নিচে প্রচুর পরিমাণে কনকনে ঠান্ডা জল-বরফ (Subsurface Water-Ice) খুঁজে পেয়েছেন তাঁরা।

আবিষ্কারের নেপথ্যে বিজ্ঞান
চাঁদের দক্ষিণ মেরুর এমন কিছু অঞ্চল রয়েছে যেখানে কোটি কোটি বছরেও সূর্যের আলো পৌঁছায়নি, যেগুলোকে বলা হয় ‘পার্মানেন্টলি শ্যাডোওড রিজিয়ন’ (PSR)। বিজ্ঞানীদের নজরে ছিল এই অঞ্চলের ‘ডাবলি শ্যাডোওড ক্রেটার্স’ বা অত্যন্ত গভীর ও অন্ধকার গর্তগুলি। মাইনাস ২৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার এই স্থানে বিলিয়ন বছর ধরে জল-বরফ জমে থাকার সম্ভাবনা ছিল। চন্দ্রযান-২-এর অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির ‘ডুয়াল ফ্রিকোয়েন্সি সিন্থেটিক অ্যাপারচার রাডার’ (DFSAR) ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা এই আবিষ্কার করেছেন। রাডারের সিগন্যাল বিশ্লেষণ করে CPR এবং DOP—এই দুটি প্যারামিটারের সমন্বয়ে একটি নিখুঁত পদ্ধতি তৈরি করেছেন পিআরএল-এর গবেষকরা। এর মাধ্যমেই দক্ষিণ মেরুর চারটি বড় গর্তের গভীরে বরফের স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। এর মধ্যে ‘ফৌস্টিনি’ ক্রেটারের ভেতরে থাকা ১.১ কিলোমিটার ব্যাসের একটি ছোট গর্তে সবচেয়ে বেশি বরফ রয়েছে বলে জানা গেছে।

কেন এটি মহাকাশ গবেষণায় গেম-চেঞ্জার?
চাঁদে জলের এই সন্ধান কেবল একটি বৈজ্ঞানিক সাফল্য নয়, এটি ভবিষ্যতের মহাকাশ মিশনের জন্য একটি ‘লাইফলাইন’। চাঁদে মানুষের বসতি স্থাপন এবং গভীর মহাকাশ অভিযানের জন্য এই জল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
১. জীবনদায়ী জল: মহাকাশচারীদের পানীয় জলের প্রধান উৎস হিসেবে এটি কাজ করবে।
২. অক্সিজেন উৎপাদন: রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় এই জল থেকে শ্বাস নেওয়ার উপযোগী অক্সিজেন তৈরি করা সম্ভব।
৩. রকেট ফুয়েল: জলকে ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন আলাদা করে রকেটের জ্বালানি তৈরি করা যাবে। এর ফলে পৃথিবী থেকে ভারী জ্বালানি বহন করার খরচ কমবে এবং চাঁদকে একটি ‘রিফুয়েলিং স্টেশন’ হিসেবে ব্যবহার করে মঙ্গল বা তার দূরের গ্রহে পাড়ি দেওয়া অনেক সহজ হবে।

মহাকাশ রেসে ভারত
২০০৮ সালে চন্দ্রযান-১-এর মাধ্যমে চাঁদে জলের কণার উপস্থিতি প্রথম প্রমাণ করেছিল ভারত। এরপর ২০২৩ সালে চন্দ্রযান-৩-এর সফল সফট ল্যান্ডিং বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল। আর এবার চন্দ্রযান-২-এর অরবিটার মাটির নিচের বরফের ভাণ্ডার চিহ্নিত করে প্রমাণ করল, মহাকাশ গবেষণায় ভারত আজ বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর দেশ। নাসা বা চিন—যখন বিশ্বের তাবড় দেশগুলো চাঁদের দক্ষিণ মেরু দখলের লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন ইসরোর এই আবিষ্কার ভারতকে সেই প্রতিযোগিতায় কয়েক ধাপ এগিয়ে দিল। এই গবেষণার ফলাফল আগামী দিনে মহাকাশ বিজ্ঞানের রূপরেখা পুরোপুরি বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy