কাঠমান্ডু, নেপাল: ১৯৫৩ সালের ঐতিহাসিক এভারেস্ট অভিযানে অংশগ্রহণকারী শেষ জীবিত সদস্য কাঞ্চা শেরপার (Kancha Sherpa) জীবনাবসান হলো। ৯২ বছর বয়সে কাঠমান্ডুর নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তী পর্বতারোহী। তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানানো হয়েছে।
স্যার এডমন্ড হিলারি (Sir Edmund Hillary) এবং তেনজিং নোরগে শেরপা (Tenzing Norgay Sherpa)-র ঐতিহাসিক অভিযানের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন কাঞ্চা শেরপা। জীবনের শেষ দিনগুলি তিনি এভারেস্টের প্রবেশদ্বার নামে পরিচিত নামচে বাজার-এ তাঁর পৈতৃক বাড়িতে কাটিয়েছেন।
নেপাল মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন (NMA)-এর সভাপতি ফুর জিয়ালজে শেরপা কাঞ্চা শেরপার অবদান স্বীকার করে বলেন, “কাঞ্চা শেরপা একজন কিংবদন্তী। এভারেস্টের প্রথম আরোহণের পর থেকে তিনিই ছিলেন একমাত্র জীবিত পর্বতারোহী। পর্বতারোহণ শিল্পকে সারা বিশ্বে জনপ্রিয় করে তুলতে তিনি কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তিনি আমাদের গোটা মাউন্টেন ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রির গডফাদার ছিলেন।”
পাঁচ টাকা বেতনে অভিযানে শুরু
১৯৩২ সালে নামচেতে জন্ম নেওয়া কাঞ্চা শেরপার পর্বতারোহণের যাত্রা শুরু হয় মাত্র ১৯ বছর বয়সে, কাজের সন্ধানে বাড়ি থেকে দার্জিলিং পালিয়ে যাওয়ার পর। সেখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয় তেনজিং নোরগে-এর, যিনি ১৯৫২ সালের তিব্বত অভিযান থেকে তাঁর বাবাকে চিনতেন। কাঞ্চার নিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে তেনজিং তাঁকে ১৯৫৩ সালের ঐতিহাসিক অভিযানে যোগ দিতে সাহায্য করেন। সেই অভিযানে তিনি ১০৩ জন শেরপার একজন হিসেবে যোগ দেন, যেখানে দৈনিক মজুরি ছিল মাত্র পাঁচ নেপালি রুপি।
কাঞ্চা শেরপা যদিও শিখরে পৌঁছননি, কিন্তু অভিযানের সাফল্যে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দক্ষিণ শিখর পর্যন্ত উঠেছিলেন। এনএমএ সভাপতি ফুর জিয়ালজে শেরপা আরও বলেন, “তাঁর সমর্থনের কারণেই তেনজিং নোরগে শেরপা এবং স্যার এডমন্ড হিলারি চূড়ায় পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিলেন; তাঁকে ছাড়া এটা সম্ভব হতো না।”
নৌকো নয়, কাঠের সেতু বানিয়েছিলেন
২০২০ সালে নেপালের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাঞ্চা শেরপা সেই অভিযানের শুরুর দিনের কথা স্মরণ করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, ৩৩ জন আরোহী এবং প্রায় ৪০০ মালবাহক নিয়ে সেই দল ভক্তপুর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল।
“তখন কোনো রাস্তা বা হোটেল ছিল না—কেবল পায়ে চলার পথ ছিল আর খাওয়ার জন্য ছিল ঝলসানো ভুট্টা,” স্মৃতিচারণ করেছিলেন তিনি। নামচে বাজারে পৌঁছতে সময় লেগেছিল ১৬ দিন।
তাঁর স্মৃতি থেকে উঠে আসে সেই অভিযানের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের গল্প। খুম্বু আইসফল-এ একটি বিশাল ফাটল পেরোনোর কোনো উপায় ছিল না। “আমাদের কাছে মই ছিল না। তাই আমরা নামচেতে ফিরে গিয়ে দশটা পাইন গাছ কেটে নিয়ে আসি, সেগুলি কাঁধে বয়ে নিয়ে যাই এবং কাঠ দিয়ে একটি সেতু তৈরি করি,” কাঞ্চা বলেছিলেন।
স্মৃতিচারণায় তিনি বলেন, ১৯৫৩ সালের ২৯ মে দুপুর ১টা নাগাদ রেডিও বার্তা আসে—তাঁরা সফল হয়েছেন। “আমরা নেচেছিলাম, একে অপরকে আলিঙ্গন করেছিলাম এবং চুমু খেয়েছিলাম। এটা ছিল এক বিশুদ্ধ আনন্দের মুহূর্ত,” স্মরণ করেছিলেন কাঞ্চা।
ইতিহাসের এই নীরব নায়কের প্রয়াণে আপনি কী মনে করেন? কমেন্ট করে জানান।