পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতির সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ‘চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ড’। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী তথা তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী (PA) চন্দ্রনাথ রথের খুনের ঘটনায় তদন্তের মোড় ঘুরল নাটকীয়ভাবে। ধৃত তিন অভিযুক্তকে আদালতে পেশ করা হলে বিচারক তাদের ১৩ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী ২৪ মে মামলার পরবর্তী শুনানি। প্রাক্তন এই বায়ুসেনা কর্মীর খুনের নেপথ্যে থাকা পেশাদার ‘কন্ট্রাক্ট কিলিং’-এর জাল কতদূর বিস্তৃত, তা জানতেই এখন মরিয়া সিট (SIT)।
আদালতে অভিযুক্তের নাটকীয় চিৎকার
এদিন অভিযুক্তদের আদালতে পেশ করার সময় এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা যখন অভিযুক্তের কাছে খুনের কারণ জানতে চান, তখন সে কেবল একটি শব্দই আওড়াতে থাকে— ‘নির্দোষ, নির্দোষ, নির্দোষ’। যদিও পুলিশের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকারি আইনজীবী আদালতে জানান, অভিযুক্তরা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। কিন্তু কার নির্দেশে এই খুন? কোথা থেকে এল আগ্নেয়াস্ত্র? ঘটনার নেপথ্যে থাকা সেই রাঘববোয়ালকে খুঁজে বের করতেই অভিযুক্তদের দীর্ঘ জেরার প্রয়োজন।
বিহার ও উত্তরপ্রদেশ যোগ এবং ডিজিটাল ট্রেল
তদন্তকারী দল জানিয়েছে, এই খুনের কিনারা করতে ভিন রাজ্যে হানা দিয়ে বড় সাফল্য মিলেছে। বিহারের বক্সার থেকে ময়ঙ্ক রাজ মিশ্র এবং ভিকি মৌর্যকে হেফাজতে নেওয়া হয়। অন্যদিকে, মূল শার্পশুটার রাজ সিংকে উত্তরপ্রদেশের বালিয়া থেকে ধাওয়া করে অযোধ্যায় পাকড়াও করে পুলিশ। রাজ সিং আদতে বালিয়ার বাসিন্দা হলেও তার পৈতৃক বাড়ি বিহারের বক্সারে। বক্সারের এক দাগি অপরাধীকে জেরা করেই এই গ্যাংটির হদিস পায় পুলিশ।
মজার বিষয় হলো, এই দুর্ধর্ষ অপরাধীরা একটি ছোট্ট ভুলে পুলিশের জালে আটকে যায়। তদন্তে উঠে এসেছে, অভিযুক্ত ময়ঙ্ক রাজ মিশ্র অপরাধের পর পালানোর সময় একটি টোল প্লাজায় ইউপিআই (UPI)-এর মাধ্যমে টাকা মেটায়। এই একটি মাত্র ডিজিটাল ট্রানজ্যাকশনই পুলিশের কাছে তুরুপের তাস হয়ে দাঁড়ায়। এরপর মোবাইল লোকেশন ট্র্যাক করে একের পর এক ঘাতককে জালে তোলে সিট। পুলিশ জানিয়েছে, ধৃতরা সকলেই কুখ্যাত অপরাধী এবং এর আগেও একাধিক টার্গেট কিলিংয়ের সঙ্গে তাদের নাম জড়িয়েছে।
পটভূমি ও রাজনৈতিক বিতর্ক
গত ৬ মে রাতে উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রাম এলাকায় দুষ্কৃতীদের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যান চন্দ্রনাথ রথ। প্রাক্তন ভারতীয় বায়ুসেনা কর্মী চন্দ্রনাথ বাবু বর্তমানে বিজেপি নেতা তথা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে কাজ করতেন। এই ঘটনার পর থেকেই রাজ্য রাজনীতি উত্তপ্ত। শুভেন্দু অধিকারী একে ‘পরিকল্পিত খুন’ এবং ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ বলে অভিহিত করেছেন। ঘাতকরা ধরা পড়লেও এখন বড় প্রশ্ন— এই খুনের মূল কারিগর বা মাস্টারমাইন্ড আসলে কে? ১৩ দিনের পুলিশি হেফাজতে সেই উত্তরই খুঁজছে গোয়েন্দারা।





