দেশের বৃহত্তম মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট (NEET UG) ২০২৬-কে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা। রাজস্থানের তদন্তকারী সংস্থাগুলোর হাতে আসা একটি ‘গেস পেপার’ বা অনুমানমূলক প্রশ্নপত্র ঘিরে দানা বেঁধেছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের জোরালো সন্দেহ। অভিযোগ উঠেছে যে, ভাইরাল হওয়া সেই গেস পেপারের সঙ্গে আসল পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের অবিশ্বাস্য মিল রয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই রাজস্থান পুলিশের স্পেশাল অপারেশনস গ্রুপ (SOG) তদন্তের জাল কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সিকারে ভাইরাল হওয়া সেই রহস্যময় প্রশ্নপত্র
তদন্তকারী সংস্থাগুলোর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এই বিতর্কের সূত্রপাত রাজস্থানের সিকার জেলা থেকে। গত ১ মে কেরালার একজন এমবিবিএস শিক্ষার্থী তাঁর সিকারের এক পরিচিতের কাছে কয়েকটি প্রশ্নের একটি তালিকা পাঠান। এরপর মুহূর্তের মধ্যে সেই নথিটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, নামী কোচিং নেটওয়ার্ক, পেয়িং গেস্ট (PG) আবাসন এবং ক্যারিয়ার কনসালট্যান্টদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রছাত্রীদের ফোনে ফোনে ঘুরতে থাকা এই নথিটি পরীক্ষার দিন যে সবার চক্ষু চড়কগাছ করে দেবে, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি।
৩০০-র মধ্যে ১৫০ প্রশ্নই কমন!
রাজস্থান এসওজি-র প্রাথমিক তদন্তে যে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে, তা চোখ কপালে তোলার মতো। ভাইরাল হওয়া সেই নথিতে থাকা মোট ৩০০টি প্রশ্নের মধ্যে প্রায় ১৪০ থেকে ১৫০টি প্রশ্ন নিট (NEET) পরীক্ষার মূল প্রশ্নপত্রের সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে। এমনকি কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, পরীক্ষার মোট ৭২০ নম্বরের মধ্যে প্রায় ৬০০ নম্বরের প্রশ্ন এই ভাইরাল নথিতে আগে থেকেই ছিল। শুধু প্রশ্নই নয়, উত্তরের বিকল্পগুলোর (Options) ক্রম পর্যন্ত একই ছিল, যা নিছক কাকতালীয় হওয়া প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যেহেতু নিট পরীক্ষায় প্রতিটি প্রশ্নের মান চার নম্বর, তাই এই মিল সত্য প্রমাণিত হলে মেধাতালিকা এবং ভর্তি প্রক্রিয়ায় বড়সড় ধস নামতে পারে।
দেশজুড়ে ধরপাকড়, এসওজি-র জালে ১৩ জন
এই ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে রাজস্থান স্পেশাল অপারেশনস গ্রুপ ইতিমধ্যে দেরাদুন, সিকার এবং ঝুনঝুনু থেকে ১৩ জন সন্দেহভাজনকে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে। এর মধ্যে সিকারের একজন প্রভাবশালী ক্যারিয়ার কাউন্সেলরকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার সঙ্গে বড় কোচিং মাফিয়ার যোগসূত্র থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন এটি কি সত্যিই খুব নির্ভুল ‘গেস পেপার’ ছিল নাকি সুপরিকল্পিতভাবে পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র বাইরে পাচার করা হয়েছিল। এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপে ‘ফরোয়ার্ডেড মেনি টাইমস’ ট্যাগযুক্ত এই প্রশ্নপত্র কত লক্ষ পরীক্ষার্থীর কাছে পৌঁছেছিল, তার হিসাব কষছে পুলিশ।
এনটিএ (NTA)-র অবস্থান ও পরবর্তী পদক্ষেপ
দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান বিতর্কের মুখে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA) একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতি জারি করেছে। তারা জানিয়েছে, ৩ মে সারা দেশে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা ও নজরদারির মধ্যে নিট ইউজি পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। তবে এনটিএ রাজস্থান এসওজি-র তদন্তের ওপর কড়া নজর রাখছে এবং পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। উল্লেখ্য, এ বছর প্রায় ২২ লক্ষ শিক্ষার্থী এমবিবিএস এবং বিডিএস কোর্সে ভর্তির লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলেন। পরীক্ষার নিরাপত্তা নিশ্চিতে জিপিএস ট্র্যাকিং, এআই ক্যামেরা এবং জ্যামার ব্যবহার করা হলেও, এই ডিজিটাল লিক রুখতে রেল মন্ত্রকের মতো বড় সংস্থাগুলোও এখন প্রশ্ন চিহ্নের মুখে। ২২ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ এখন ঝুলে রয়েছে এসওজি-র চূড়ান্ত রিপোর্টের ওপর।





