৬০ পেরোলেই চরম ঝুঁকি, ব্রেন স্ট্রোক কেন প্রবীণদের নীরব ঘাতক? এই ৫ উপসর্গ দেখলে ১ মিনিটও দেরি নয়।

ব্রেন স্ট্রোক, যা ‘সেরিব্রোভাসকুলার অ্যাকসিডেন্ট’ নামেও পরিচিত, তা প্রবীণদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুতর স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থার মধ্যে অন্যতম। যখন মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত ​​সরবরাহ বাধাগ্রস্ত বা মারাত্মকভাবে কমে যায়, তখন মস্তিষ্কের কোষ অক্সিজেন এবং পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়। মিনিটের মধ্যেই মস্তিষ্কের কোষগুলি মরতে শুরু করে, যার ফলে কথা বলা, চলাফেরা বা স্মৃতিশক্তির মতো নির্দিষ্ট কিছু ক্রিয়াকলাপ আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক মৃত্যুর অন্যতম কারণ হল ব্রেন স্ট্রোক।৬০ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণরা বার্ধক্যজনিত শারীরিক পরিবর্তন, বিদ্যমান রোগ এবং জীবনযাত্রার কারণে স্ট্রোকের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন। প্রবীণরা কেন বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলি দ্রুত চেনা এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা—এগুলিই জীবন ও স্থায়ী অক্ষমতার মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।কেন প্রবীণরা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ?বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধমনীর স্থিতিস্থাপকতা কমে যায়, ফলে রক্তনালী বন্ধ বা ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। প্রবীণদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল এবং হৃদরোগের মতো বেশ কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগ স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।ধমনীর পরিবর্তন: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্তনালীর প্রাচীর নমনীয়তা হারায় এবং ফ্যাট জমা হয়, যা ইস্কেমিক স্ট্রোকের (রক্তনালী ব্লক হওয়া) প্রধান কারণ।দীর্ঘস্থায়ী রোগের প্রভাব: অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ মস্তিষ্কের রক্তনালী ফেটে যেতে পারে, আর ডায়াবেটিস মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী ছোট ছোট নালীগুলির ক্ষতি করতে পারে।হৃদপিণ্ডের ছন্দ-ব্যাধি: প্রবীণদের মধ্যে সাধারণ একটি সমস্যা, অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন (অনিয়মিত হৃদস্পন্দন), হৃদপিণ্ডের প্রকোষ্ঠে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। এই জমাট বাঁধা রক্ত মস্তিষ্কে গিয়ে স্ট্রোক ঘটায়।শারীরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ক ক্ষণস্থায়ী অক্সিজেন-স্বল্পতা সহ্য করার ক্ষমতা হারায়।স্ট্রোকের প্রকারভেদ ও ‘মিনি স্ট্রোক’প্রধানত দুই ধরনের স্ট্রোক দেখা যায়:ইস্কেমিক স্ট্রোক (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে): মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী নালী রক্তপিন্ড দ্বারা অবরুদ্ধ হলে এটি ঘটে।হেমোরেজিক স্ট্রোক (কম ক্ষেত্রে): দুর্বল রক্তনালী ফেটে গেলে মস্তিষ্কের ভিতরে বা আশেপাশে রক্তক্ষরণ হয়।প্রবীণদের জন্য ট্রানজিয়েন্ট ইস্কেমিক অ্যাটাক (TIA বা মিনি স্ট্রোক) চেনা অত্যন্ত জরুরি। এটিকে ‘সতর্ককারী স্ট্রোক’ও বলা হয়। এর লক্ষণগুলি স্ট্রোকের মতোই, তবে এটি কয়েক মিনিট বা ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হয় না এবং স্থায়ী ক্ষতি করে না। তবে এটি ভবিষ্যতের বড় স্ট্রোকের উচ্চ ঝুঁকি নির্দেশ করে।স্ট্রোকের সংকেত চিনুন: এটাই ‘গোল্ডেন আওয়ার’স্ট্রোক একটি সত্যিকারের চিকিৎসা জরুরি অবস্থা। দ্রুত লক্ষণ চেনা গেলেই সময়মতো চিকিৎসা এবং পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা বাড়ে। স্ট্রোকের লক্ষণগুলি মনে রাখার জন্য সহজ উপায় হলো F.A.S.T. পদ্ধতি।সংকেত (F.A.S.T)বর্ণনাFace Drooping (মুখ বেঁকে যাওয়া)মুখের এক দিক ঝুলে যেতে পারে বা অসাড় লাগতে পারে। হাসতে বললে হাসি অসমান হবে।Arm Weakness (হাত দুর্বল হওয়া)উভয় হাত উপরে তুললে একটি হাত নিচের দিকে নেমে যেতে পারে।Speech Difficulty (কথা বলার সমস্যা)কথা জড়িয়ে যাওয়া বা কথা বলতে না পারা।Time to Call (ডাকার সময়)এই লক্ষণগুলি দেখা গেলেই অবিলম্বে জরুরি পরিষেবার জন্য কল করুন।অন্যান্য লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে: হঠাৎ শরীরের একপাশে অসাড়তা, বিভ্রান্তি, দেখতে অসুবিধা, এবং কোনো কারণ ছাড়া হঠাৎ প্রচণ্ড মাথাব্যথা।চিকিৎসার জরুরি অবস্থা: স্ট্রোক হলে সময়ই মূল কথা। প্রতি মিনিটে বিপুল সংখ্যক মস্তিষ্কের কোষ মারা যায়। প্রাথমিক $1$ থেকে $2$ ঘণ্টার মধ্যে (গোল্ডেন আওয়ার) চিকিৎসা হস্তক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিটি স্ক্যান বা এমআরআই-এর মাধ্যমে দ্রুত স্ট্রোকের ধরন নিশ্চিত করা হয় এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করা হয়।প্রবীণদের জন্য প্রতিরোধের উপায়বার্ধক্য অনিবার্য হলেও, স্বাস্থ্যকর অভ্যাস এবং নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়।নিয়মিত রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ: রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নিয়মিত ওষুধ সেবন করা।সুগার ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ: সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের মাধ্যমে এই মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা।সক্রিয় থাকুন: হাঁটা, যোগা বা সাঁতারের মতো মাঝারি ধরনের কার্যকলাপ রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে।ধূমপান ও মদ্যপান ত্যাগ: এমনকি দেরিতেও এগুলো ছাড়া শুরু করলে ঝুঁকি কমে।মানসিক চাপ সামলান: একাকীত্ব ও শারীরিক সমস্যার কারণে প্রবীণদের স্ট্রেস বেশি থাকে। যোগা ও সামাজিক কাজে যুক্ত থাকার মাধ্যমে মানসিক শান্তি বজায় রাখুন।আগামী ২৯ নভেম্বর বিশ্ব স্ট্রোক দিবস। স্ট্রোকের এই ভয়াবহতা রুখতে সকলের মধ্যে সচেতনতা, দ্রুত চিকিৎসা পরিষেবা এবং সাশ্রয়ী মূল্যে চিকিৎসার অ্যাক্সেস বাড়ানো জরুরি।