৬০০ বছরের প্রাচীন পুজো! যেখানে আজও কালিদাসের মন্ত্রে আরাধনা ও সন্ধিপুজোয় আসে অলৌকিক প্রজাপতি

দুর্গাপুজো মানেই বাংলার ঘরে ঘরে আনন্দ আর ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। আর গ্রামবাংলার সাবেকি পারিবারিক পুজোগুলি সেই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছে অলৌকিক গল্পগাথা ও প্রাচীন রীতিনীতির হাত ধরে। এমনই এক অনন্য ও রহস্যঘেরা পুজোর দেখা মেলে পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোলের সালানপুর ব্লকের এথোড়া গ্রামে। চক্রবর্তী ও মুখোপাধ্যায় পরিবারের এই ‘বড় দুর্গা’ পুজো প্রায় ৬০০ বছরের প্রাচীন বলে প্রবীণদের দাবি। এই পুজোকে কেন্দ্র করে আজও জিইয়ে রয়েছে শতবর্ষের নানা বিস্ময়কর কৃত্য ও প্রাচীন ঐতিহ্য।

এই পুজোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সূচনা ও আচার-অনুষ্ঠান। জিতাষ্টমীর পরের দিন অর্থাৎ নবমী তিথি থেকে সাধারণ পুজোর ১৫ দিন আগেই এখানে ছাগ বলির মাধ্যমে দুর্গাপুজোর সূচনা হয়। আজও সপ্তমী, অষ্টমীর সন্ধিক্ষণ এবং নবমীতে ছাগ, ভেড়া ও মহিষ বলির প্রথা কঠোরভাবে পালিত হয়। এই হাইটেক যুগেও আধুনিক কোনো বই বা প্রিন্টেড মন্ত্র নয়, বরং লাল শালু কাপড়ে যত্নে মোড়া কয়েকশো বছরের প্রাচীন তালপাতার পুঁথি পাঠ করেই দেবীর আরাধনা করেন পুরোহিতরা। পরিবারের সদস্যদের দাবি, এই পুঁথিতে মহাকবি কালিদাসের সময়কালের দুর্গা মন্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে, যা ছুঁলেই গায়ে শিহরণ জাগে।

প্রতিমা নির্মাণেও রয়েছে সাবেকিয়ানা ও বংশপরম্পরার এক দুর্লভ নিদর্শন। একই পরিবারের প্রতিমা শিল্পীরা বছরের পর বছর ধরে সম্পূর্ণ হাতের ছোঁয়ায় এই মূর্তি তৈরি করে আসছেন, যেখানে কোনো ধরনের ছাঁচ ব্যবহার করা হয় না। যুগ বদলালেও প্রতিমার মুখের গড়ন বা রূপের কোনো পরিবর্তন হয়নি। একইভাবে বংশপরম্পরায় ঢাক বাজিয়ে আসছেন নির্দিষ্ট পরিবারের ঢাকিরাই। এই মন্দিরের অন্যতম রোমাঞ্চকর আকর্ষণ হলো সন্ধিপুজো। অতীতে তামার পাত্র জলে বসিয়ে সন্ধি নির্ধারিত হলেও বর্তমানে অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণের ঠিক মুহূর্তে বন্দুক ফাটিয়ে সংকেত দেওয়া হয়। এই বন্দুকের আওয়াজ পাওয়ার পরেই গ্রামের অন্যান্য মন্দিরগুলিতে সন্ধিপুজোর বলিদান শুরু হয়। আর সবচেয়ে বড় অলৌকিক ব্যাপার হলো, প্রতিবছর সন্ধিপুজোর নির্দিষ্ট মুহূর্তে একটি বিশাল আকারের প্রজাপতি এসে মায়ের গায়ে এসে বসে, যা দেখতে ভিড় জমান দূর-দূরান্তের মানুষ। দেবোত্তর সম্পত্তি ও পারিবারিক অনুদানে চলা এই পুজো আজ কেবল আর আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নেই, বরং দুই পরিবারের শত শত মানুষের মহামিলন উৎসবে পরিণত হয়েছে।