৩০ বছর পর বাড়ি ফিরলেন নিখোঁজ ছেলে! নির্বাচন কমিশনের এক ফর্মেই বদলে গেল ভাগ্য, কুর্নুলের পুনর্মিলনে ভাসল চোখের জলে

অন্ধ্রপ্রদেশের কুর্নুল জেলা থেকে ভাগ্যের এক অবিশ্বাস্য খেলা এবং সময়ের চক্রের এমন এক হৃদয়বিদারক ঘটনা সামনে এসেছে, যা যেকোনো মানুষকে আবেগপ্রবণ করে তুলবে। দীর্ঘ তিন দশক ধরে নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে পরিবারের কাছে ফিরে এলেন এক যুবক। ১৯৯৬ সালে দশম শ্রেণীর পরীক্ষায় ফেল করার অপরাধবোধ এবং পরিবারের তিরস্কারের ভয়ে যিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন, ৩০ বছর পর তিনি যখন বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কাছে ফিরে এলেন, তখন সেই দৃশ্য দেখে এলাকাবাসীরও চোখ ভিজে ওঠে। নির্বাচন কমিশনের একটি দাপ্তরিক এসআইআর (SIR) ফর্মের সূত্র ধরেই এই অটুট ও অলৌকিক পারিবারিক মিলন সম্ভব হয়েছে।

প্রাপ্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুর্নুল জেলার এমিগানুর এলাকার বাসিন্দা ইয়েল্লাম্মা ও ইয়েল্লাপ্পা দম্পতির পরিবারে মোট পাঁচ সন্তান ছিল। ১৯৯৬ সালে তাঁদের বড় ছেলে রামা এবং তার চাচাতো ভাই নাগারাজু দুজনেই দশম শ্রেণীর বোর্ড পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়। পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর পরিবারের কঠোর বকাঝকা ও তিরস্কারের ভয়ে দুই কিশোর অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং কোনোপ্রকার পূর্বসতর্কতা ছাড়াই বাড়ি ছেড়ে চিরতরে পালিয়ে যাওয়ার পথ বেছে নেয়। দীর্ঘ ছয় বছর কেটে যাওয়ার পর নাগারাজু নিজের ভুল বুঝতে পেরে বাড়ি ফিরে এলেও, ভয়ের চোটে রামা নিজের অতীত লুকিয়ে সুদূর প্রবাসেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

এরপর কেটে যায় দীর্ঘ সময়। মুম্বই, পুনে এবং বেঙ্গালুরুর মতো দেশের বড় বড় মেট্রোপলিটন শহরগুলিতে দিনমজুর হিসেবে চরম পরিশ্রম করে নিজের জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে শুরু করে রামা। বেঙ্গালুরুতে এসে সে ধীরে ধীরে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের ভাগ্য বদলায় এবং নিজস্ব পায়ের ওপর শক্তভাবে দাঁড়ায়। পরবর্তীতে সে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং তার একটি সুন্দর ও সুখী সংসারও গড়ে ওঠে। কিন্তু জীবনের এই নতুন অধ্যায়ে পৌঁছেও রামার মনের ভেতর সর্বক্ষণ তার কুখ্যাত শৈশবের ভুল, জন্মভিটে, বৃদ্ধ বাবা-মা এবং ভাইবোনদের স্মৃতি নিদারুণভাবে ঘুরপাক খেত। বহুবার ফিরে আসার ইচ্ছা থাকলেও ছেলেবেলার অপরাধবোধের কারণে সে নিজ গ্রামে পা রাখার সাহস অর্জন করতে পারেনি।

তবে ভাগ্যের চাকা কখন কীভাবে ঘুরে যায়, তা কেউ জানে না। ঠিক ত্রিশ বছর পর এই দীর্ঘস্থায়ী পারিবারিক বিচ্ছেদের গল্পে এক অভাবনীয় মোড় আসে, যা চিরদিনের মতো পাল্টে দেয় রামার জীবন। সম্প্রতি সরকারি দাপ্তরিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে রামাকে নির্বাচন কমিশনের একটি এসআইআর (SIR) আবেদনপত্র পূরণ করতে হয়েছিল। সেই প্রশাসনিক ফর্মটিতে তার বাবা-মায়ের পুরো নাম এবং তাদের আদি শহরের সঠিক স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করার নির্দেশ ছিল। ফর্মের কলামে জন্মদাতা বাবা-মায়ের নাম এবং পৈতৃক গ্রামের ঠিকানা নিজের হাতে লিখতে গিয়েই রামার ভেতরের আবেগপ্রবণ মনটি ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। শৈশবের সেই হারানো স্মৃতির টানে সে তখনই মনে মনে দৃঢ় সংকল্প করে যে, যেকোনো মূল্যে তাকে এবার তার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে পুনরায় মিলিত হতেই হবে।

অবশেষে দীর্ঘ ৩০ বছর পর যখন রামা তার জন্মস্থান এমিগানুরে এসে উপস্থিত হয়, তখন সেখানকার পরিবেশ অত্যন্ত আবেগঘন ও হৃদয়স্পর্শী হয়ে ওঠে। বহু বছর ধরে যে ছেলেকে মৃত কিংবা চিরতরে হারিয়ে যাওয়া নিখোঁজ ব্যক্তি হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন বার্ধক্যে উপনীত বাবা-মা, হঠাৎ করে চোখের সামনে তাকে সশরীরে জীবিত অবস্থায় দেখতে পেয়ে তাঁদের ধৈর্যের সমস্ত বাঁধ ভেঙে যায়। আনন্দের জল গলে নামতে থাকে বয়সের ভাঁজ পড়া গাল বেয়ে। দীর্ঘ তিন দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এই অলৌকিক পুনর্মিলন প্রমাণ করল যে, রক্তের টান এবং নিখাদ পারিবারিক ভালোবাসা শত প্রতিকূলতা ও সময়ের ব্যবধান পেরিয়েও মানুষকে তার শিকড়ের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে বাধ্য করে।