নয়াদিল্লি [ভারত]: মুম্বাইয়ের অন্ধকার জগতের রূঢ়, বিপজ্জনক স্পন্দন নিয়ে যে কটি ছবি তৈরি হয়েছে, রাম গোপাল ভার্মার (RGV) ‘কোম্পানি’ তাদের মধ্যে অন্যতম। ২০০২ সালের ১২ এপ্রিল মুক্তি পাওয়া এই ছবিটি শুধু সংগঠিত অপরাধের চিত্রায়ণ করেনি, বরং দর্শকদের সোজা টেনে নিয়ে গিয়েছিল সেই নৃশংস হৃদয়ের গভীরে। মুক্তির ২২ বছর পরেও ‘কাল্ট ক্লাসিক’-এর মর্যাদা ধরে রেখেছে এই ছবি, যার বহু ডাই-হার্ড ফ্যান ৫০ বারেরও বেশি ছবিটি দেখেছেন বলে দাবি করেন।
grim, gripping, এবং চমকপ্রদ বাস্তবতায় ভরা এই ছবিটি ভারতীয় গ্যাংস্টার সিনেমার সংজ্ঞা বদলে দিয়েছিল।
‘সত্য’ থেকে ‘কোম্পানি’: RGV-এর বিবর্তন
নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে রাম গোপাল ভার্মা ভারতীয় দর্শকদের কাছে এক নতুন ধরনের সিনেমা তুলে ধরেন—যা ছিল তীব্র বাস্তবধর্মী এবং যার অ্যাকশন দৃশ্যগুলো ফিকশন ও বাস্তবের মধ্যেকার রেখা মুছে দিত। ১৯৯৮ সালে মুক্তি পায় ‘সত্য’, যেখানে মনোজ বাজপেয়ী অভিনীত ‘ভিকু মাত্রে’ চরিত্রটি কিংবদন্তি হয়ে যায়। ‘সত্য’-এর সাফল্যের পর RGV একই থিমে ফেরেন ‘কোম্পানি’ নিয়ে। তবে এবার গ্যাংস্টারদের চিত্রায়ণ ছিল আরও বেশি সুসংগঠিত, যা মুম্বাইয়ের সংগঠিত অপরাধের পরিবর্তিত গতিশীলতার প্রতিফলন।
পরবর্তী এক সাক্ষাৎকারে RGV নিজেই ‘সত্য’ ও ‘কোম্পানি’-র পার্থক্য ব্যাখ্যা করে বলেন, “‘সত্য’ তৈরির সময় আমি আন্ডারওয়ার্ল্ডকে ভালো করে বুঝতাম না। কিন্তু সেই ছবি তৈরির সময়ই আমি এই জগৎ সম্পর্কে আরও জানতে শুরু করি। ১৯৯৮ সালের পর গ্যাং ওয়ার আরও তীব্র হয়। ‘কোম্পানি’ ছিল আমার পক্ষ থেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডকে আরও সুসংগঠিত, ব্যবসায়িক উপায়ে তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টা।”
আন্ডারওয়ার্ল্ডের আসল কাহিনি: দাউদ-ছোটা রাজনের দ্বন্দ্ব
‘কোম্পানি’ ছিল সংগঠিত অপরাধ এবং বলিউডের মধ্যকার জটিল সম্পর্ক নিয়ে একটি পরিণত বিশ্লেষণ। ছবিটি বাস্তব জীবনের কুখ্যাত ডন দাউদ ইব্রাহিম এবং ছোটা রাজন-এর উত্থান ও তাদের মধ্যে ফাটলের কাহিনিকে প্রতিফলিত করে। এই দুই ডন একসময় মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ড শাসন করত। কিন্তু তাদের বন্ধুত্ব একসময় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিণত হয়, যা ২০০০ সালে ব্যাংককে ছোটা রাজনকে হত্যা করার চেষ্টার মাধ্যমে শেষ হয়।
এই ছবির ধারণা RGV পেয়েছিলেন হান্নাফ কাদাওয়ালা নামে এক ফিল্ম প্রযোজকের কাছ থেকে, যিনি ১৯৯৩ সালের মুম্বাই বোমা হামলায় অভিযুক্ত ছিলেন। হান্নাফ কাদাওয়ালা, যিনি পরে ২০০১ সালে খুন হন, তার আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরাসরি যোগ ছিল এবং তিনিই নাকি বলিউড অভিনেতা সঞ্জয় দত্তকে অস্ত্র সরবরাহ করেছিলেন। তাঁর কাছ থেকেই RGV ‘কোম্পানি’-র ধারণা পান। ছবির শিরোনামটিও দাউদ ইব্রাহিমের অপরাধী সংগঠন ডি-কোম্পানিকে (D-Company) ইঙ্গিত করে।
তারকাদের প্রস্তুতি এবং বাস্তব চরিত্রের প্রতিফলন
অজয় দেবগণ, বিবেক ওবেরয়, মনীষা কৈরালা, অন্তরা মালী, মোহনলাল, সীমা বিশ্বাস এবং আকাশ খুরানা সহ একঝাঁক তারকার সমাবেশ ছিল এই ছবিতে। মাত্র ৮ কোটি টাকা বাজেটে তৈরি এই ছবিটি বিশ্বব্যাপী ২৫ কোটি টাকা ব্যবসা করে এবং ২০০২ সালের অষ্টম সর্বোচ্চ আয়কারী ভারতীয় চলচ্চিত্র ছিল।
বিবেক ওবেরয়ের অভিষেক: এই ছবির মাধ্যমেই বলিউডে পা রাখেন বিবেক ওবেরয়। ছোটা রাজনের উপর ভিত্তি করে তৈরি ‘চান্দু’ চরিত্রে সম্পূর্ণ প্রবেশ করার জন্য তিনি মুম্বাইয়ের একটি বস্তিতে থাকতেন, গায়ের রং কালো করেছিলেন এবং স্থানীয় রাস্তার ভাষা (টাপোড়ি) শিখেছিলেন।
মোহনলালের চরিত্র: কিংবদন্তি মালয়ালম অভিনেতা মোহনলাল এখানে একজন কড়া মুম্বাই পুলিশ কমিশনারের চরিত্রে অভিনয় করেন। এই চরিত্রটি ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত পদে থাকা ধনুষকোড়ি শিবানন্দনের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল, যিনি মুম্বাইয়ের সংগঠিত অপরাধ চক্র ভেঙে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।
দীর্ঘ দুই দশক পরেও ‘কোম্পানি’ শুধুমাত্র একটি চলচ্চিত্র নয়, এটি ভারতীয় গ্যাংস্টার ঘরানার একটি মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়, যা বাস্তবতার সঙ্গে বলিউডের গ্ল্যামারকে একসূত্রে বেঁধে দিয়েছিল।