১৬৯ বছর আগের ভুল মানচিত্র বাদ দিয়ে নতুন বিশ্ব ম্যাপের ডাক! রাষ্ট্রসংঘের টেবিলে ভারতের অবস্থান ঘিরে শোরগোল

রাষ্ট্রসংঘে বিশ্ব মানচিত্র সঠিকভাবে প্রদর্শনের জন্য আফ্রিকার দেশ টোগোর আনা ‘ইকুয়াল এরিয়া ম্যাপ প্রজেকশন’ বা সমান এলাকা মানচিত্র তৈরির প্রস্তাব বিপুল ভোটে পাস হয়েছে। ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে ভারতসহ ১৬৪টি দেশ এই পরিবর্তনকে সমর্থন করলেও, এ নিয়ে নিজেদের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট করে দিয়েছে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক। নয়াদিল্লি সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, রাষ্ট্রসংঘের এই উদ্যোগে প্রস্তাবিত বিশ্ব মানচিত্রে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল দুটিকে অবশ্যই ভারতের সরকারি মানচিত্র অনুযায়ী দেখাতে হবে। এগুলির কোনো ধরনের ‘ভুল’ বা ‘বিভ্রান্তিকর’ চিত্রায়ন ভারত কোনোভাবেই বরদাস্ত করবে না।

আফ্রিকার দেশ টোগোর উত্থাপিত এই প্রস্তাবটির ওপর গত শুক্রবার ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৬৪টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ায় তা বিপুল ভোটে পাস হয়। এই ঘটনার পরই বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল নয়াদিল্লির কঠোর অবস্থান ব্যাখ্যা করে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, ভারত ভোট দিলেও এই প্রস্তাবটি কোনো নির্দিষ্ট মানচিত্র, মানচিত্র তৈরির পদ্ধতি বা জাতীয় সীমানার কোনো বিশেষ চিত্রায়নকে সুনির্দিষ্টভাবে সমর্থন করে না। ভারতের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডের অখণ্ডতার বিষয়ে দেশের অবস্থান সর্বদা স্পষ্ট, সুদৃঢ় এবং এ বিষয়ে কোনো রকম আপস করা হবে না।

কেন বদলাচ্ছে বিশ্ব মানচিত্র?

এতদিন ধরে বিশ্বজুড়ে যে মানচিত্রটি ব্যবহার করা হয়ে আসছে, তা মূলত ষোড়শ শতাব্দীর ‘মার্কেটর প্রজেকশন’-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ১৫৬9 সালে ইউরোপীয় নাবিকদের সুবিধার জন্য এই মানচিত্র তৈরি করেছিলেন গেরার্ডাস মার্কেটর। পৃথিবীর গোলীয় আকৃতিকে সমতল কাগজে ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে ওই মানচিত্রে বিষুবরেখার কাছাকাছি দেশগুলিকে তাদের প্রকৃত আকারের চেয়ে ছোট এবং মেরু অঞ্চলের দেশগুলিকে আকারে অনেক বড় দেখানোর ত্রুটি থেকে যায়। উদাহরণস্বরূপ, ওই পুরনো মানচিত্রে বিশাল আফ্রিকা মহাদেশকে ইউরোপ বা গ্রিনল্যান্ডের সমান বা তার চেয়েও ছোট দেখানো হয়েছে, অথচ বাস্তবে আফ্রিকা মহাদেশ গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়।

এই ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক ত্রুটি সংশোধন করার জন্যই ২০১৮ সালে একটি নিখুঁত ‘সমান পৃথিবী’ মানচিত্র তৈরি করা হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আফ্রিকান ইউনিয়নের ৫৪টি দেশই এই মানচিত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে, কারণ এটি সমস্ত মহাদেশকে তাদের প্রকৃত অনুপাতে তুলে ধরে। আফ্রিকান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর পূর্ণ সমর্থনে টোগো এই মানচিত্রটি রাষ্ট্রসংঘে উপস্থাপন করে। ১৯৩টি দেশের মধ্যে ১৬৪টি দেশ এতে সায় দিলেও এস্তোনিয়া, জর্জিয়া, লিথুয়ানিয়া, মলদোভা, সার্বিয়া এবং ইউক্রেন ভোটদানে বিরত থাকে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রস্তাবটির বিপক্ষে একমাত্র ভোটটি প্রদান করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

বিদেশ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে পুনরায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, রাষ্ট্রসংঘের এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য শুধুমাত্র সমান ক্ষেত্রফল ভিত্তিক মানচিত্র তৈরির পদ্ধতিকে উৎসাহিত করা এবং মহাদেশীয় ভূখণ্ডগুলির প্রকৃত অনুপাত বজায় রাখা। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমানা, বিতর্কিত অঞ্চল বা স্থানের নাম নির্ধারণের রাজনৈতিক বিষয়ের কোনো প্রত্যক্ষ যোগ নেই। তবে দেশের অখণ্ডতা এবং মানচিত্রের নিখুঁত উপস্থাপনের প্রশ্নে ভারত যে নিজের অবস্থানে অনড়, তা এই কড়া বার্তায় ফের প্রমাণিত হলো।