পাতলা হচ্ছে তুষারের চাদর, উষ্ণায়নের ফাঁদে কি ধ্বংসের মুখে পড়তে চলেছে পৃথিবী?

উত্তর মেরু ঘিরে থাকা আর্কটিক অঞ্চলে সমুদ্রের বরফ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে গলছে। শুধু বরফের পরিমাণই কমছে না, বরং প্রতি বছর বরফ গলে থাকার সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে দীর্ঘ হচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক নতুন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ১৯৭৯ সালের তুলনায় বর্তমান সময়ে আর্কটিক সাগরের বরফ গলার সময় প্রায় সাড়ে ৭ দিন বেশি স্থায়ী হচ্ছে। এর ফলে সমুদ্র আগের তুলনায় অনেক বেশি সূর্যের তাপ শোষণ করতে পারছে, যা আর্কটিকের স্থানীয় তাপমাত্রা তো বটেই, সেই সঙ্গে গোটা পৃথিবীর উষ্ণায়ন পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছে দিচ্ছে। বিজ্ঞানীদের কাছে তাই বরফ গলার এই দীর্ঘ সময় বিশ্বজুড়ে জলবায়ু সঙ্কটের অন্যতম বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নেতৃত্বে করা এই বিশ্লেষণটি গত ২ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। প্রায় পাঁচ দশকের বিশাল তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে গবেষকরা কেবল আর্কটিক সাগরের বরফের পরিমাণই খতিয়ে দেখেননি, বরং বরফের পুরুত্ব, বয়স এবং তার ওপর জমে থাকা তুষারের স্তরের পরিবর্তনগুলোও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন।
কেন বরফ গলার মরশুম বাড়ছে উদ্বেগ?
বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সমুদ্রের বরফ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাদা রঙের বরফ সূর্যের ক্ষতিকর আলো ও তাপ অনেকটাই প্রতিফলিত করে সরাসরি মহাকাশে ফিরিয়ে দেয়। গবেষণা অনুযায়ী, উজ্জ্বল সমুদ্রের বরফ সূর্যের প্রায় ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ আলো প্রতিফলিত করতে সক্ষম। অন্যদিকে, বরফহীন গাঢ় সমুদ্রের জল মাত্র প্রায় ৭ শতাংশ আলো প্রতিফলিত করতে পারে।
ফলে আর্কটিকে বরফ কমে গেলে আরও বেশি পরিমাণে গাঢ় সমুদ্রের জল সূর্যের সরাসরি সামনে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। সেই জল অতিরিক্ত সৌরশক্তি শোষণ করে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠে। এই জমে থাকা তাপের কারণে শরৎকালে নতুন করে বরফ তৈরি হতে আরও বেশি সময় নেয়। অর্থাৎ, কম বরফ—বেশি সূর্যের আলো শোষণ—সমুদ্রের জল উষ্ণ হওয়া এবং বরফ তৈরি হতে দেরি হওয়ার মতো একটি বিপজ্জনক দুষ্টচক্র তৈরি হচ্ছে।
নতুন বরফ হচ্ছে আরও পাতলা ও দুর্বল
সমস্যার এখানেই শেষ নয়। কেবল বরফ তৈরি হতে দেরি হচ্ছে তা নয়, বরং শেষ পর্যন্ত যখন বরফ তৈরি হচ্ছে, তাও তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত পাতলা এবং দুর্বল প্রকৃতির হচ্ছে। এর ফলে পরবর্তী বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে সেই বরফ আরও সহজে এবং দ্রুত গলে যাচ্ছে। এই অবিরাম প্রক্রিয়ায় এক বছরের কম বয়সি বরফ পরের বছর আরও বেশি পরিমাণে বরফ গলার পরিস্থিতি তৈরি করছে।
গবেষণায় আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের কথা উঠে এসেছে। আর্কটিকের সমুদ্রের বরফের উপর জমে থাকা তুষারের স্তর আগের তুলনায় অনেক বেশি পাতলা হয়েছে এবং বরফের পৃষ্ঠও আগের চেয়ে মসৃণ হয়ে পড়েছে। এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব কেবল জলবায়ুর ওপরই পড়ছে না, বরং আর্কটিকের নিজস্ব জীববৈচিত্র্য ও প্রাণীকূলের ওপরও মারাত্মক থাবা বসাচ্ছে। মেরু ভাল্লুক এবং সিলের মতো প্রাণীরা সাধারণত মোটা ও অসমান সমুদ্রের বরফের ওপর জমে থাকা তুষারের স্তূপের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে। সেখানে তারা বরফের ডেরা তৈরি করে এবং শাবকদের বড় করে তোলে। কিন্তু বরফ ও তুষারের স্বাভাবিক গঠনে পরিবর্তন আসায় তাদের বাসস্থান এবং প্রজননের প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলে বড় ধাক্কা
সমুদ্রের বরফের মধ্যে এবং তার আশপাশে থাকা ক্ষুদ্র শৈবাল আর্কটিকের পুরো সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের মূল ভিত্তি। অত্যন্ত কম আলোতেও বেঁচে থাকার উপযোগী পরিবেশে এই শৈবালগুলি অভিযোজিত হয়েছে। বরফ ও তুষারের স্তর পাতলা হলে অতিরিক্ত সূর্যের আলো বরফ ভেদ করে আরও গভীরে পৌঁছাতে শুরু করে। এর ফলে ওই শৈবালের প্রাকৃতিক পরিবেশ দ্রুত বদলে যায়।
যেহেতু এই শৈবাল সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের একেবারে গোড়ায় অবস্থান করে, তাই এদের ওপর যেকোনো ধরনের পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পরবর্তী ধাপে মাছ এবং অন্যান্য বড় সামুদ্রিক প্রাণীর ওপরও পড়ে। এর জেরে আর্কটিক এবং তার সংলগ্ন সাব-আর্কটিক অঞ্চলের মৎস্যশিল্পও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অ্যান্টার্কটিকার পরিস্থিতি কেন আলাদা?
এই গবেষণায় আর্কটিক এবং অ্যান্টার্কটিকার মধ্যকার ভৌগোলিক ও পরিবেশগত পার্থক্যের দিকটিও তুলে ধরা হয়েছে। আর্কটিক হলো মূলত চারদিক থেকে স্থলভাগ দ্বারা বেষ্টিত একটি মহাসাগর। পক্ষান্তরে, অ্যান্টার্কটিকা হলো বিশাল সমুদ্র দ্বারা ঘেরা একটি পূর্ণাঙ্গ মহাদেশ। এই মৌলিক ভৌগোলিক পার্থক্যের কারণেই দুই মেরুর জলবায়ু ব্যবস্থা একভাবে পরিবর্তিত হয় না। দীর্ঘ সময় ধরে অ্যান্টার্কটিকায় আর্কটিকের মতো সমুদ্রের বরফের লাগাতার পতন দেখা না গেলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সেখানেও পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে। গত চার বছরে অ্যান্টার্কটিকায় সমুদ্রের বরফের রেকর্ড পরিমাণ হ্রাস লক্ষ্য করা গেছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, আর্কটিকের এই ভয়াবহ পরিবর্তন কেবল বরফের পরিমাণ কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরফ গলার সময় দীর্ঘ হওয়া, নতুন বরফ তৈরি হতে দেরি হওয়া এবং তৈরি হওয়া বরফ দুর্বল ও পাতলা হয়ে যাওয়ার এই প্রবণতা পুরো পৃথিবীর পরিবেশের জন্য এক অশনি সঙ্কেত।