১১ বছরেই বাজিমাত বাগডোগরার! যাত্রীসংখ্যা বাড়ল সাড়ে তিনগুণ, উত্তরবঙ্গের নয়া অর্থনৈতিক লাইফলাইন

উত্তরবঙ্গের আকাশপথের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু বাগডোগরা বিমানবন্দর গত এক দশকে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে। শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেন নেক’-এর উপকণ্ঠে অবস্থিত এই বিমানবন্দরটি বর্তমানে উত্তরবঙ্গ, সিকিম এবং পূর্ব হিমালয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও পর্যটন মানচিত্রে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ বছরে যাত্রী সংখ্যা এবং বিমান চলাচলের পরিসংখ্যানে নজিরবিহীন রেকর্ড গড়েছে বাগডোগরা।

বিমানবন্দরের ডিরেক্টর নাভিদ নাজিম জানান, ২০১৪-১৫ অর্থবর্ষের তুলনায় ২০২৬ সালে বাগডোগরার কর্মক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এক সময় যেখানে এখান থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাত্র ৪৫০টি বিমান চলাচল করত, বর্তমানে সেই সংখ্যা ৮৬০-এর গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। বার্ষিক যাত্রী সংখ্যাও ১০.৬ লক্ষ থেকে লাফিয়ে পৌঁছেছে ৩৬.৫ লক্ষে। অর্থাৎ, এক দশকের ব্যবধানে যাত্রী পরিবহণ প্রায় সাড়ে তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে, বার্ষিক বিমান চলাচলের সংখ্যা ১০,১২৫ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০,১৩০-এ।

শুধু যাত্রী পরিবহণ নয়, পণ্য বা কার্গো পরিবহণের ক্ষেত্রেও বাগডোগরা অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে। ২০১৪-১৫ সালে যেখানে পণ্য পরিবহণের পরিমাণ ছিল ২,২৩৫ মেট্রিক টন, বর্তমানে তা বেড়ে ৯,৩৫০ মেট্রিক টনের বেশি হয়েছে। উত্তরবঙ্গের বিখ্যাত চা শিল্প, পর্যটন এবং স্থানীয় বাণিজ্যের বিকাশে এই কার্গো বৃদ্ধির ভূমিকা অপরিসীম। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৮৪টি বিমান ওঠানামা করে এবং গড়ে ১৪,৫০০ যাত্রী এই পরিষেবা ব্যবহার করেন।

ক্রমবর্ধমান এই যাত্রীচাপ সামলাতে পুরনো টার্মিনাল কার্যত হিমশিম খাচ্ছে। এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে ১৫৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি হচ্ছে একটি অত্যাধুনিক নতুন টার্মিনাল। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রকল্পের প্রায় ৩৭ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। নতুন এই টার্মিনাল চালু হলে বছরে এক কোটি যাত্রীকে পরিষেবা দেওয়া সম্ভব হবে। এছাড়াও, ভুটান ও থাইল্যান্ডের মতো আন্তর্জাতিক গন্তব্যের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বাগডোগরার গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।

যাত্রী পরিষেবাকে আরও উৎসবমুখর করতে এবং পরিষেবার মান উন্নত করার বার্তা দিতে আগামী ১৬ জুন, মঙ্গলবার বিমানবন্দর চত্বরে পালিত হবে ‘যাত্রী সুবিধা দিবস’। এই বিশেষ দিনে যাত্রীদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্য ও চক্ষু পরীক্ষা শিবির, রক্তদান কর্মসূচি, ঐতিহ্যবাহী দার্জিলিং চা পরিবেশন এবং মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওইদিন আগত যাত্রীদের বিশেষ অভ্যর্থনা জানানো হবে এবং কর্মী ও যাত্রীরা সম্মিলিতভাবে ‘বন্দে মাতরম’ গেয়ে দেশের প্রতি সম্মান জ্ঞাপন করবেন।

সব মিলিয়ে, বাগডোগরা বিমানবন্দর এখন নিছক একটি পরিবহণ কেন্দ্র নয়, বরং এটি উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হিসেবে নতুন ভারতের উন্নয়নের প্রতীক হয়ে উঠছে। নতুন টার্মিনাল প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি কেবল যাত্রী পরিষেবাই নয়, উত্তরবঙ্গের সামগ্রিক পরিকাঠামো এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।