হোটেলের খাবারে গবাদিপশুর খাদ্য! বেলপাহাড়ির রেস্তোরাঁয় হানা দিয়ে চোখ কপালে তুলল খাদ্য দফতর

বাড়ির ছোটোখাটো অনুষ্ঠান হোক কিংবা উইকেন্ডে বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সঙ্গে কোনও হোটেল বা রেঁস্তোরায় খেতে যাওয়ার আনন্দ—এই সমস্ত আয়োজনের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক ভয়ঙ্কর ও পচা বাস্তব। স্বাদের সাধ মেটাতে গিয়ে অজান্তেই আমরা নিজেদের শরীরে মারাত্মক বিষ প্রবেশ করাচ্ছি না তো? মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কঠোর নির্দেশে রাজ্যজুড়ে একযোগে ব্যাপক অভিযান চালাচ্ছে খাদ্য দফতর। আর এই রুটিন ও সারপ্রাইজ ভিজিট থেকেই একে একে সামনে আসছে এমন সব শিহরণ জাগানো ছবি, যা জানলে যেকোনো সুস্থ মানুষের গায়ের চামড়া কুঁকড়ে যাবে। কোথাও পুকুরের পচা জলে তৈরি হচ্ছে বিরিয়ানি, কোথাও আবার হোলি খেলার বিষাক্ত রং দিয়ে তৈরি হচ্ছে মিষ্টি। এই আবহে সম্প্রতি সামনে এল আরও এক চাঞ্চল্যকর ও গা শিউরে ওঠার মতো অভিযোগ। পর্যটন কেন্দ্র ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ির একটি জনপ্রিয় হোটেলে রান্নার কাজে প্রকাশ্যেই ব্যবহার করা হচ্ছে গবাদিপশুর খাদ্য! পাশাপাশি জলপাইগুড়ির বিখ্যাত হোটেলেও মিলল দুর্গন্ধযুক্ত পচা খাবার ও ফাঙ্গাস পড়া বাসি মাংস।
পুকুরের জলে বিরিয়ানির চাঞ্চল্যকর ঘটনার স্মৃতি কাটতে না কাটতেই আরও ভয়ংকর এক চিত্র ধরা পড়ল খাদ্য দফতরের বিশেষ অভিযানে। ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ির অত্যন্ত পরিচিত ‘হালদার হোটেল অ্যান্ড রেস্তোঁরা’য় সাধারণ মানুষকে গবাদি পশুর খাবার খাওয়ানোর মারাত্মক অভিযোগ উঠল। বেলপাহাড়ি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হওয়ায় প্রতিদিন এখানে বহু দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকরা ঘুরতে আসেন, অথচ সেই পর্যটকদের অঞ্চলেই দিনের পর দিন চলছে এই রমরমা কারবার! হোটেলের রান্নাঘরের অন্দরের ছবিটা এতটাই নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর যে দেখলে বমি পায়। চারিদিকে ময়লা, আবর্জনা, পচা নোংরা জল এবং ভনভন করছে মাছি ও পোকা। শুধু তাই নয়, রান্নাঘরের ঠিক মাঝখানেই বেপরোয়াভাবে পালন করা হচ্ছে জ্যান্ত মুরগি, আর ঘরের চতুর্দিকে ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে সেই মুরগির মল-মূত্র। ঝুলছে ছেঁড়া নোংরা লুঙ্গি। এই চরম অবহেলার মাঝেই উদ্ধার হয়েছে পশুখাদ্য। খাদ্য দফতরের অধিকারিকরা রেঁস্তোরা কতৃপক্ষকে সরাসরি প্রশ্ন করেন, ‘ক্যাটেল মানে কী? চারপেয়ে যারা, চারপেয়ে। আপনি মানুষকে খাওয়াচ্ছেন, কেন?’ এই সোজাসাপ্টা প্রশ্নের মুখে সম্পূর্ণ চুপচাপ ওতমোড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন হোটেলের কর্মীরা। তাৎক্ষণিকভাবে ওই হোটেলের ফুড লাইসেন্স সম্পূর্ণ সাসপেন্ড করে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, জলপাইগুড়ির হোটেল ‘হেভেনস ডিউ’-এর ফ্রিজ খুলতেই খাদ্য আধিকারিকদের চোখ কপালে ওঠে। একে একে বেরিয়ে আসে দিনের পর দিন ধরে জমে থাকা বাসি, পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত খাবার। কাঁড়ি কাঁড়ি পচা বাসি ভাত, মাছ এবং মাংস মজুত করে রাখা হয়েছিল যা থেকে প্রচণ্ড উৎকট গন্ধ বের হচ্ছিল। এই গুরুতর বিষয়ে জলপাইগুড়ি সদরের ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক প্রীতম বোস জানান, এখানে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ জনের খাবার একসঙ্গে পচা অবস্থায় মজুত ছিল, যার গায়ে ইতিমধ্যেই ফাঙ্গাস বা ছত্রাক ধরে গিয়েছিল। মুখ খুলতেই তীব্র গন্ধে টেকা দায় হয়ে পড়েছিল। যদিও অভিযুক্ত হোটেলের ম্যানেজার দায় এড়াতে অদ্ভুত যুক্তি দিয়ে দাবি করেন যে খাবার নাকি পচা নয়, কেবল আধিকারিকদের পছন্দ হচ্ছে না বলেই তা ফেলে দেওয়া হচ্ছে। শুধু ঝাড়গ্রাম বা জলপাইগুড়িই নয়, ধূপগুড়ির একাধিক মিষ্টির দোকান ও ছানার কারখানাতেও স্বাস্থ্যবিধির ন্যূনতম বালাই নেই। প্লাস্টিকের নোংরা ড্রামে লিটার লিটার দুধ খোলা অবস্থায় মজুত করে রাখা হয়েছে, যাতে ভনভন করছে মাছি। সঙ্গে সঙ্গে সেই সমস্ত ক্ষতিকারক দুধ ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেন পরিদর্শক দল। পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে চানাচুর কারখানায় বেনিয়ম এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলায় মেয়াদ-উত্তীর্ণ মিষ্টি ও প্যাকেটজাত বেবি ফুড বিক্রির অপরাধে দুটি দোকানকে ১৪ দিনের জন্য কঠোরভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য খাদ্য দফতর। চারদিকে এই ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর কারবারের জেরে সাধারণ মানুষের জনস্বাস্থ্য এখন চরম সংকটের মুখে।