লাইক পাওয়ার নেশা থেকে বিশ্ব জয়! আজনার নদীকে আবর্জনামুক্ত করে এবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইতিহাস গড়লেন মধ্যপ্রদেশের ‘বিট্টু’

বলিউডের জনপ্রিয় সিনেমা ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবির কাল্পনিক কাহিনীর সঙ্গে বহু মানুষের জীবন মেলানোর প্রবণতা থাকে, তবে অনেক সময় বাস্তব চিত্রনাট্য সিনেমাকেও লজ্জায় ফেলে দেয়। সিনেমার পর্দায় ফারহানের দুর্দান্ত ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফি দেখে যেমন বিশ্ববিখ্যাত ফটোগ্রাফার আন্দ্রে ইস্তোভান তাঁকে কাজ দেওয়ার জন্য ডেকেছিলেন, ঠিক তেমনই এক অভাবনীয় ও অবিশ্বাস্য ঘটনা বাস্তব রূপ নিল মধ্যপ্রদেশের ২০ বছর বয়সি এক সাধারণ তরুণের জীবনে। নেটপাড়ায় যিনি মূলত ‘বিট্টু তাবাহি’ (Bittu Tabahi) নামেই সর্বাধিক পরিচিত। নিজ বাসভবনের পাশ দিয়ে বয়ে চলা পরিচিত আজনার নদীকে সম্পূর্ণ একা হাতে জঞ্জালমুক্ত করে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশাল শোরগোল ফেলার পর, এবার সরাসরি নেদারল্যান্ডসের বিশ্ববিখ্যাত পরিবেশ সংস্থা ‘দ্য ওশান ক্লিনআপ’ (The Ocean Cleanup)-এর পক্ষ থেকে সরাসরি কাজের অভাবনীয় প্রস্তাব পেলেন এই প্রতিভাবান ভারতীয় তরুণ। তাঁর এই অবিশ্বাস্য সাফল্য আজ গোটা দেশের যুবসমাজকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে।
দেশের ছোট-বড় বহু নদীর অবস্থাই আজ চরম অবহেলায় আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে, আর মধ্যপ্রদেশের আজনার নদী ও তার তীরবর্তী অঞ্চলও এর ব্যতিক্রম ছিল না। টন টন প্লাস্টিক, বাতিল বোতল এবং শ্যাওলার পুরু স্তূপে নদীটির স্বাভাবিক গতিপথ ও প্রাণস্পন্দন সম্পূর্ণরূপে রুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনের মুখাপেক্ষী হয়ে অলস বসে না থেকে, একরাশ জেদ ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে নিজেই নদীটির পুনর্জীবনে ঝাঁপিয়ে পড়েন তরুণ বিট্টু। নিজের পকেট থেকে প্রায় ৩০ হাজার টাকা জমিয়ে খরচ করে তিনি সম্পূর্ণ একা হাতেই নদীটিকে জঞ্জালমুক্ত ও ঝকঝকে করে তোলেন। এরপর জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ইনস্টাগ্রামে নদীটির পরিষ্কার করার আগের ও পরের অবিশ্বাস্য রূপান্তরের ছবি ও ভিডিও শেয়ার করতেই তা রাতারাতি ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়ে যায়। চলতি বছরের মার্চ মাসে দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পপতি আনন্দ মাহিন্দ্রাও তাঁর এই নিঃস্বার্থ কাজের ভূয়সী প্রশংসা করে মন্তব্য করেছিলেন যে, যদি লাইক বা পপুলারিটি পাওয়ার উদ্দেশ্য থেকেও কেউ এমন অসাধারণ মহৎ কাজ করে থাকেন, তবে তাতে বিন্দুমাত্র আপত্তির কোনো কারণ থাকতে পারে না।
দেশের গণ্ডী পেরিয়ে বিট্টুর এই সাহসিকতা ও কাজের আন্তর্জাতিক খ্যাতি এবার সরাসরি নজর কাড়ে বিশ্বজুড়ে সমুদ্র ও নদী পরিষ্কারের কাজে নিয়োজিত প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘দ্য ওশান ক্লিনআপ’-এর প্রতিষ্ঠাতা তথা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) বয়ান স্ল্যাটের (Boyan Slat)। তিনি নিজের ভেরিফায়েড এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে বিট্টুর কাজের কড়া প্রশংসা করে সরাসরি আমন্ত্রণ জানিয়ে লেখেন—”Come work for us” (আমাদের সঙ্গে কাজ করতে চলে এসো)। বিশ্বখ্যাত পরিবেশপ্রেমীর এই তিন শব্দের সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত ওজনদার নিমন্ত্রণ মুহূর্তের মধ্যে নেটদুনিয়ায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। যদিও এটি এখনও পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বা পাকা চাকরির নিয়োগপত্র নয় এবং এতে পদের নাম বা মোটা বেতনের অংক নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, তবুও দেশের প্রবুদ্ধ নেটিজেনদের মতে, একা এক তরুণের অদম্য সততা ও লড়াইয়ের মানসিকতা আজ তাঁর সামনে বিশ্বের বৃহত্তম জলভাগ সাফাই অভিযানে শামিল হওয়ার এক ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে।