হিমালয়ে মহাপ্রলয়! তিব্বত-নেপাল সীমান্তে আকস্মিক হড়পা বানে ৫৫৮ জন নিখোঁজ, মৃত বেড়ে ১৭৭!

চিনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি সূত্রে প্রাপ্ত খবরে জানা গিয়েছে, নেপাল সীমান্তবর্তী তিব্বত অঞ্চলে সংঘটিত এক বিশাল ভূমিধসের জেরে সৃষ্ট আকস্মিক হড়পা বানে অন্তত ৫৫৮ জন মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন। একই সঙ্গে, নদীর উজানে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক বাঁধের কারণে আরও ভয়াবহ ভূতাত্ত্বিক বিপর্যয়ের আশঙ্কায় জরুরি সতর্কতা জারি করেছে বেজিং প্রশাসন। চিনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র লিন জিয়ান জানিয়েছেন, এই বিধ্বংসী দুর্যোগের কবলে পড়ে নেপালের অংশে প্রায় ১০০ জন চিনা নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তিব্বত-নেপাল সীমান্তের গিয়িরং (Gyirong) এলাকার নিকটবর্তী লেন্দে (Lhende) নদীতে হাজার হাজার টন কাদা, মাটি ও পাথরের বিশাল স্তূপ ধসে পড়ার পরেই এই নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই ভয়াবহ বিপর্যয়ে ইতোমধ্যে অন্তত তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
ভয়াবহ এই হড়পা বানের জেরে ভোটে কোশি (Bhote Kosi) ও ত্রিশূলী (Trishuli) নদীর জলের প্রবল স্রোত ধেয়ে এসে নেপালের একাধিক গ্রাম ও শহরাঞ্চলে মারাত্মক তাণ্ডব চালায়। আকস্মিক এই বন্যার ফলে নেপালের ভাটি অঞ্চলে অন্তত ১৭৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং শত শত মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। জলের তোড়ে বহু ঘরবাড়ি, পাকা রাস্তাঘাট, সেতু এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তিব্বতের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পার্বত্য এলাকার গ্রামগুলি থেকে বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং দুই গ্রামবাসীকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
এদিকে, হিমালয় সীমান্তবর্তী এলাকার উজানে তৈরি হওয়া একটি বিপজ্জনক ‘ব্যারিয়ার লেক’ বা প্রাকৃতিক বাঁধের হ্রদ থেকে নতুন করে বড় বিপদের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে চিনা কর্তৃপক্ষ। এই জটিল প্রাকৃতিক পরিস্থিতি চলমান উদ্ধারকাজকে আরও ব্যাহত করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। চিনের জলসম্পদ মন্ত্রক ওই হ্রদের ওপর নজরদারি এবং মূল্যায়ন বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। দুর্যোগকবলিত এলাকার উত্তর-পূর্ব দিকে ছোচেন খোলা (Chhochen Khola) ও পুরেপু সাংপো (Purepu Tsangpo) নদীর সংযোগস্থলে হ্রদটি তৈরি হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, হ্রদটিতে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার জল ধারণ ক্ষমতা রয়েছে এবং তা ইতিমধ্যেই উপচে পড়তে শুরু করেছে। এমনকি আগামী তিন দিনের মধ্যে সেখানে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার জল জমা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই জরুরি পরিস্থিতিতে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ দ্রুত পরিচালনার জন্য বেজিং ও চেংদু থেকে বিশেষ দমকল ও উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় পুলিশ এবং সশস্ত্র বাহিনীকে তাঁরা সর্বাত্মক সাহায্য করছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গিয়িরং শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা কোনোমতে পুনরায় চালু করা সম্ভব হলেও সীমান্ত বন্দর ও চেকপয়েন্টগুলির সঙ্গে সংযোগকারী এলাকাগুলিতে এখনও যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপাল ও তিব্বতের এই সাম্প্রতিক দুর্যোগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। হিমালয়ের বরফ ও জলাধার ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতা এই গোটা অঞ্চলের জনবসতি, অত্যাধুনিক পরিকাঠামো এবং পানীয় জলের সুরক্ষার জন্য এক বিশাল বড় হুমকি তৈরি করেছে। এর আগেও এই অঞ্চলে একই ধরনের আকস্মিক বন্যা দেখা গিয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে অতিরিক্ত তাপমাত্রার জেরে তিব্বতের একটি হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ উপচে পড়েছিল। সেই মর্মান্তিক ঘটনায় ৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং নেপাল ও চিনের সংযোগকারী কৌশলগত একটি সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল।