হাতি-গণ্ডারের জঙ্গল পেরিয়ে ৭ কিমি লড়াই! বনবস্তির প্রথম মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী সুমিলা

জলপাইগুড়ির গরুমারা জঙ্গলঘেরা এক প্রত্যন্ত জনপদ বুধুরাম বনবস্তি। যেখানে সন্ধে নামলে হাতির ডাক আর বন্যপ্রাণের আতঙ্কই জীবন। সেই গ্রাম থেকে এর আগে কেউ মাধ্যমিক পরীক্ষার গণ্ডি ছোঁয়ার সাহস দেখায়নি। কিন্তু এবার সেই অসাধ্য সাধন করে ইতিহাস তৈরি করল ১৫ বছরের কিশোরী সুমিলা ওরাওঁ। বন্যপ্রাণীদের মোকাবিলা করে প্রতিদিন ৭ কিলোমিটার জঙ্গলপথ সাইকেলে পাড়ি দিয়ে সুমিলা আজ নিজের গ্রামের প্রথম মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী।

জঙ্গল আর বুনো হাতির মোকাবিলা: ময়নাগুড়ি ব্লকের রামসাই গ্রাম পঞ্চায়েতের এই বনবস্তি থেকে পানবাড়ি ভবানী হাইস্কুলের দূরত্ব প্রায় সাত কিলোমিটার। সুমিলা প্রতিদিন সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যায়। পথে পড়ে গরুমারা জাতীয় উদ্যানের ঘন জঙ্গল। প্রায়ই দেখা মেলে হাতি, গণ্ডার বা বাইসনের। অনেক সময় বাড়ির উঠোন দিয়েও হেঁটে যায় হাতির পাল। কিন্তু প্রাণের ঝুঁকি থাকলেও পড়াশোনার জেদ সুমিলাকে ঘরে আটকে রাখতে পারেনি। অন্ধকার নামার আগেই টিউশন সেরে ঘরে ফেরার লড়াই সুমিলার নিত্যদিনের সঙ্গী।

পরিবারের লড়াই ও স্বপ্ন: সুমিলার বাবা মঞ্চাল ওরাওঁ পেশায় কৃষক। অভাবের সংসারে বাবা-মা পড়াশোনা করতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু মেয়ের জেদের সামনে তাঁরা পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছেন। সুমিলার মা রূপালি ওরাওঁ বলেন, “ভয় তো লাগেই, মেয়ে একা জঙ্গলের পথ দিয়ে যায়। কিন্তু ও বড় হতে চায়, আমরাও চাই ও পড়াশোনা শিখুক।” গ্রামের ২৭টি পরিবারের কাছে সুমিলা এখন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। প্রতিবেশী বুধুয়া ওরাওঁ-এর কথায়, “সুমিলা আমাদের গর্ব। ও পাশ করলে গ্রামে শিক্ষার আলো আসবে।”

ভবিষ্যৎ ও প্রশাসনের আশ্বাস: এ বছর আমগুড়ি রামমোহন হাইস্কুলে সিট পড়েছে সুমিলার। পরীক্ষার হল থেকে আত্মবিশ্বাসী সুমিলা জানায়, “আমি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে চাই। গ্রাম থেকে কেউ মাধ্যমিক দেয়নি, আমিই প্রথম। ভয়কে জয় করে গ্রামের নাম উজ্জ্বল করতে চাই।” সুমিলার এই অদম্য লড়াইকে কুর্নিশ জানিয়েছে প্রশাসনও। ময়নাগুড়ি পঞ্চায়েত সমিতির নারী ও শিশু কর্মাধ্যক্ষ পদ্মমণি রায় জানিয়েছেন, সুমিলার উচ্চশিক্ষার জন্য সব ধরনের সহযোগিতা করবে প্রশাসন। আজ শুধু একটি গ্রাম নয়, গোটা জলপাইগুড়ি তাকিয়ে সুমিলার সাফল্যের দিকে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy