সোশ্যাল মিডিয়ায় জাত তুলে গালাগালি করলেই কড়া আইনি কড়াঘাত! বড় নির্দেশ দিয়ে আলিপুর আদালতের রায় খারিজ হাইকোর্টের

ডিজিটাল মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়ার প্ল্যাটফর্মে জাত তুলে বা ধর্ম নিয়ে অশালীন এবং কুরুচিকর মন্তব্য করলে ছাড় পাওয়ার দিন শেষ। শুধুমাত্র সামনাসামনি গালিগালাজ করাই নয়, সাইবার মাধ্যমে জাতিগত অপমানের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও আইনি পথে কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হবে অভিযুক্তদের। এক বিশেষ মামলার শুনানিতে এমনই স্পষ্ট বার্তা দিল কলকাতা হাইকোর্ট। বিচারপতির বেঞ্চ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ফেসবুক বা মেটা কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট তথ্য দেয়নি এই যুক্তিতে পুলিশ বা নিম্ন আদালত অপরাধমূলক তদন্ত গুটিয়ে নিতে পারে না।

ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল এক ব্যক্তির দায়ের করা অভিযোগকে কেন্দ্র করে। রবিউল ইসলাম বুলবুল এবং সয়ন দত্ত নামের দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফেসবুকে তাঁর জাতিগত পরিচয়, ধর্ম ও পরিবারকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ এবং জাতিবিদ্বেষমূলক মন্তব্য করার অভিযোগ তুলেছিলেন এক ব্যক্তি। অভিযোগের সমর্থনে ফেসবুক পোস্টগুলির ডিজিটাল স্ক্রিনশট ও লিঙ্ক জমা দিয়ে বেহালা থানায় এসসি-এসটি (SC-ST) আইনের ৩(১)(আর)/(এস) ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছিল। তদন্ত চলাকালীন পুলিশ অভিযোগকারীর জবানবন্দি রেকর্ড করলেও, সাইবার সেশনের মাধ্যমে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ব্যবহারকারীর লগ বা বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা যায়নি। এই কারণে ২০২৩ সালের ২০ জানুয়ারি তদন্তকারী সংস্থা আদালতে একটি ‘নিল’ (Nil) বা চূড়ান্ত ক্লোজার রিপোর্ট পেশ করে। সেই রিপোর্টকে ভিত্তি করেই একই বছরের ২৭ জুন আলিপুরের বিশেষ আদালত আবেদনকারীর মামলাটি খারিজ করে দেয়। নিম্ন আদালতের সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করেই কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন ক্ষুব্ধ আবেদনকারী।

মামলার শুনানি শেষে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি উদয় কুমার বিশেষ আদালতের সেই যুক্তি সম্পূর্ণ খারিজ করে দেন। আদালত পর্যবেক্ষণে জানায়, প্রতিটি ফৌজদারি মামলার বিচার তার নিজস্ব পৃথক তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। ডিজিটাল মাধ্যমে জাতিগত অপমানের মতো সংবেদনশীল অভিযোগকে এভাবে তুচ্ছ বা গুরুত্বহীন বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। মেটা বা ফেসবুকের সরাসরি প্রতিক্রিয়া না পাওয়ার কারণে তদন্ত থমকে যাওয়া উচিত ছিল না; বরং আইপি লগ, ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট এবং অন্যান্য ফরেনসিক উপায়ের সাহায্যে সত্য উদঘাটন করা তদন্তকারী সংস্থার দায়িত্ব ছিল। পর্যাপ্ত ডিজিটাল প্রমাণ ও স্ক্রিনশট থাকা সত্ত্বেও সাইবার সেলের সাহায্য না নেওয়ায় তদন্তে বড় ধরনের ঘাটতি থেকে গিয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছে উচ্চ আদালত।

ফলস্বরূপ, আলিপুর বিশেষ আদালতের ২০২৩ সালের ২৭ জুনের নির্দেশ সম্পূর্ণ বাতিল করে দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। অপরাধমূলক পোস্টগুলির সঠিক ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট এবং প্রোফাইল লগ শনাক্ত করতে অবিলম্বে সাইবার-ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, আদালতের এই রায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানোর তিন মাসের মধ্যে ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ১৭৩(৮) ধারায় নতুন করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে আদালত। সাইবার অপরাধ দমনে হাইকোর্টের এই নির্দেশ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে আইনি মহলের একাংশ।