সামান্য ঝগড়ার জেরে আলাদা থাকলেই কি মিলবে খোরপোশ? আমেদাবাদ আদালতের বড় রায়ে চিন্তায় বহু দম্পতি!

সামান্য মতপার্থক্য কিংবা ছোটখাটো পারিবারিক ঝগড়ার কারণে যদি কোনো বৈধ বা জোরালো কারণ ছাড়াই কোনো স্ত্রী তাঁর স্বামীর থেকে আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নেন, তবে আইন অনুযায়ী তিনি স্বামীর কাছ থেকে কোনো ধরনের ভরণপোষণ বা খোরপোশ পাওয়ার অধিকারী হবেন না। সম্প্রতি গুজরাতের আমেদাবাদ পারিবারিক আদালতের তরফ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক মামলার রায় দিতে গিয়ে এই আইনি অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। আদালতের এই সুদূরপ্রসারী রায় দেশের আইনি মহলে ও বিবাহিত দম্পতিদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

আদালত সূত্রে প্রাপ্ত বিবরণে প্রকাশ, গুজরাতের এক দম্পতি বিয়ের পরপরই কাজের সূত্রে মুম্বইয়ে চলে এসেছিলেন। মামলা চলাকালীন আদালতে করা আবেদনে স্ত্রী দাবি করেন যে, প্রতিদিনের সাংসারিক জীবন ও স্বামীর সঙ্গে তাঁর নানা বিষয়ে মতপার্থক্য তৈরি হওয়ায় নিয়মিত অশান্তি ও ঝগড়া হচ্ছিল। এই পরিস্থিতির জেরেই তিনি একসময় মুম্বইয়ের সংসার ছেড়ে নিজের বাবা-মায়ের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং পরবর্তীতে স্বামীর কাছ থেকে মাসিক খোরপোশ আদায়ের জন্য আমেদাবাদের পারিবারিক আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন।

উভয়পক্ষের আইনজীবীদের দীর্ঘ সওয়াল-জবাব, পেশ করা নথিপত্র এবং সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করার পর আমেদাবাদ পারিবারিক আদালত অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানায় যে, স্বামীর সঙ্গ ত্যাগ করে আবেদনকারী স্ত্রীর আলাদা থাকার পেছনে এমন কোনো গুরুতর বা আইনগতভাবে বৈধ কারণ ছিল না, যার ভিত্তিতে তাঁকে নিয়মিত ভরণপোষণ দেওয়া যেতে পারে। আদালত তার রায়ে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে, যদি কোনো স্ত্রী কোনো ধরনের জোরালো ও গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়াই স্বেচ্ছায় স্বামীর সঙ্গে বসবাস করতে অস্বীকার করেন বা সংসার ছেড়ে চলে যান, তবে আইনের চোখে তিনি কোনোভাবেই ভরণপোষণ পাওয়ার যোগ্য নন।

এই মামলার শুনানির সময় আদালতে পেশ করা সাক্ষ্যপ্রমাণ থেকে স্পষ্টভাবে প্রতিপন্ন হয়েছে যে, আবেদনকারী স্ত্রী সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছাতেই স্বামীর গৃহত্যাগ করেছিলেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, স্বামীর বিরুদ্ধে যে সমস্ত অভিযোগ তোলা হয়েছিল—যেমন শারীরিক বা মানসিক অত্যাচার, পণ বা যৌতুকের দাবি কিংবা প্রাণনাশের সুনির্দিষ্ট হুমকি—তার সপক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ আদালতে দাখিল করতে পারেননি স্ত্রী। বিচারক ও আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্বামী-স্ত্রীর দৈনন্দিন জীবনে ছোটখাটো মতপার্থক্য বা মনমালিন্য থাকতেই পারে, কিন্তু শুধুমাত্র সেই ঘাত-প্রতিঘাতের অজুহাতে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই ভরণপোষণ দাবি করার পক্ষে যথেষ্ট হতে পারে না।

এই প্রসঙ্গে ইটিভি ভারতকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিশিষ্ট পারিবারিক আদালতের আইনজীবী অভিষেক প্রজাপতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করে জানিয়েছেন, “আমেদাবাদ আদালতের এই সুনির্দিষ্ট রায় বৈবাহিক বিরোধ ও ভরণপোষণ সংক্রান্ত মামলার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা হয়ে উঠবে। ফৌজদারি কার্যবিধির বা নতুন আইনি বিধিমালার ১২৫(৪) ধারা অনুযায়ী, কোনো স্ত্রী যদি কোনো সন্তোষজনক বা যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই স্বামীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকেন, তবে তিনি আইনিভাবে ভরণপোষণ পাওয়ার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। তবে একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা দরকার যে, প্রতিটি মামলাই তার নিজস্ব তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে আলাদাভাবে বিচার করা হয়, ফলে এই রায় যান্ত্রিকভাবে সব ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নাও হতে পারে।”

আইনজীবী প্রজাপতি আরও জানান যে, এই রায়ের পর থেকে ভবিষ্যতের পারিবারিক মামলাগুলিতে আদালত অত্যন্ত নিবিড় ও কঠোরভাবে খতিয়ে দেখবে যে, স্বামীর সংসার থেকে আলাদা হয়ে থাকার জন্য স্ত্রী যে সমস্ত যুক্তি বা কারণ প্রদর্শন করছেন, তার আইনি ভিত্তি কতটা পোক্ত। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে এই ধরনের খোরপোশের মামলায় কেবল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শারীরিক দূরত্ব বা বিচ্ছেদ প্রমাণ করাই যথেষ্ট হবে না, বরং সেই বিচ্ছেদের পেছনে আইনগতভাবে বৈধ এবং অকাট্য কারণ রয়েছে কি না, তা আদালতের সামনে যথাযথভাবে প্রমাণ করতে হবে। আইনি বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় যেমন একদিকে একপক্ষের অযৌক্তিক দাবি থেকে সুরক্ষা দেবে, তেমনই বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আইনি দায়িত্ব ও সম্পর্কের পবিত্রতা বজায় রাখার ওপর নতুন বার্তা দেবে।